পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল আগামীকাল সোমবার ঘোষণা করা হবে। এই ফলাফল কেবল নবান্নের (রাজ্য সচিবালয়) ক্ষমতা দখলই নিশ্চিত করবে না, টানা ১২ বছর ধরে চলা মোদি যুগের এই পর্যায়ে ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথও নির্ধারণ করবে।
পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা আসনে গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়। এর মধ্যে ফলতা আসনের ভোটগ্রহণ গত শনিবার স্থগিত করা হয়েছে।
অভূতপূর্ব ২ হাজার ১০০ কোম্পানির বেশি আধা-সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই নির্বাচন পরিচালিত হয়। সামগ্রিকভাবে ভোটগ্রহণ ছিল শান্তিপূর্ণ। এতে ৯২ শতাংশেরও বেশি ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক অতীতে বাংলা দেখেনি।
এবারের নির্বাচনী প্রচার ছিল অস্বাভাবিক রকমের উত্তপ্ত এবং একাধিক বিতর্কে ঠাসা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিরোধ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং এর পাশাপাশি পরিচয়ের রাজনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্প উন্নয়ন, সুশাসন, নারী নিরাপত্তা এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়ার মতো বিষয়গুলো এই নির্বাচনের মোড় নির্ধারণ করেছে।
তবে ফলাফল যা-ই হোক না কেন, একে কেবল মমতা সরকারের বিরুদ্ধে একটি রায় হিসেবে দেখা হবে না।
একে বিশ্লেষণ করা হবে, বিজেপির তাদের চিহ্নিত করা ‘শেষ সীমানায়’ বিস্তার লাভের ক্ষমতার ওপর এক গণভোট হিসেবে, আঞ্চলিক বিরোধী দলগুলোর শক্তির পরীক্ষা হিসেবে এবং পরিচয়ের রাজনীতির মেরুকরণের স্থায়িত্বের এক লিটমাস টেস্ট হিসেবে।
বিজেপি যদি জয়ী হয়
বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির জয়যাত্রার বড় প্রভাব রয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি দেশের বড় একটি অংশে অভাবনীয় সাফল্য পেলেও বাংলায় মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল।
২০১৯ সালের মধ্যে বিজেপি বড় ধরনের চমক দেখিয়ে রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়লাভ করে এবং ৪০ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পায়।
২০২৬ সালের জয় হবে সেই সফলতার পূর্ণতা, যার ইঙ্গিত আগে পাওয়া গেলেও ২০২১ সালে তা অর্জিত হয়নি। সেবার তৃণমূল ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টি পেয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল।
বিজেপি এখনো পশ্চিমবঙ্গের কোনো পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রণ করে না, যা বাংলায় দলটির সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার বড় প্রমাণ। তাই এখানে জয়লাভ করা হবে এক বিশাল রূপান্তর।
বাংলা কেবল আরেকটি বড় রাজ্য নয়। এটি পূর্ব ভারতে বিজেপির আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ বাধা এবং এর রয়েছে বিশাল প্রতীকী গুরুত্ব। এখানে জয়লাভ করার অর্থ উত্তরপ্রদেশের পূর্ব দিকে দলটির ‘গেরুয়া মানচিত্র’ পূর্ণ করা। এটি জাতীয় নেতা হিসেবে মমতার অবস্থানকেও নাটকীয়ভাবে দুর্বল করে দেবে।
৭১ বছর বয়সী মমতা দীর্ঘকাল ধরে আঞ্চলিক বিরোধীদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মুখ; যিনি লড়াকু, নির্বাচনে পরীক্ষিত এবং নিজের শর্ত ছাড়া কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটে যুক্ত হতে নারাজ।
নিজ রাজ্যে পরাজয় তার রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটাবে না ঠিকই, তবে এটি তাকে বিজেপি বিরোধী জোটের মূল কারিগরের বদলে কেবল একজন ‘টিকে থাকা’ নেতায় পরিণত করবে।
বিজেপির বাংলায় আসার পথ তৈরি হয়েছে কিছু নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে। যেমন সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ), যেখানে বিজেপি নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রাজ্যে বিজেপি সরকার এলে নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে, অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে শিলিগুড়ি করিডোরে পুলিশি ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনী এলাকায় হিন্দু ভোট একীভূত করা হবে।
তৃণমূল যদি ক্ষমতা ধরে রাখে
তৃণমূলের জয়, তা যদি কম ব্যবধানেও হয়, তার নিজস্ব গুরুত্ব বহন করবে। এটি প্রমাণ করবে, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং জোরালো আঞ্চলিক আবেগ বা ‘পরিচয় সত্তার’ রাজনীতি থাকলে বিজেপির মতো বিশাল সাংগঠনিক ও সম্পদশালী শক্তিকেও ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব।
এটি এই ধারণাকেও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং দলটির বিস্তারের ক্ষেত্রে এটি একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
তৃণমূলের জয় মমতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করবে। কারণ বিজেপি এবার বাংলায় তাদের সবচেয়ে বড় তারকাদের মাঠে নামিয়েছিল—প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কমপক্ষে ১৬ জন মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সে এক বিশাল বহর।
এই জয়কে মমতা কেবল তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে জয় হিসেবে দেখবেন না, বরং নির্বাচন কমিশনসহ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘ষড়যন্ত্রের’ (বিশেষ করে এসআইআর ইস্যু) বিরুদ্ধেও নিজের নৈতিক জয় হিসেবে দাবি করবেন।
অধিকাংশ বুথফেরত জরিপ বিজেপির এগিয়ে থাকার আভাস দিয়েছে। তবে অন্তত দুটি জরিপ তৃণমূলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পূর্বাভাস দিয়েছে। অবশ্য বুথফেরত জরিপ প্রায়ই ভুল প্রমাণ হয়, যেমনটি ২০২১ এবং ২০২৪ সালেও হয়েছিল।
চূড়ান্ত ফলাফল যা-ই হোক না কেন, পর্যবেক্ষকদের মতে মমতার ভোটব্যাংকে কিছুটা ধস নামার লক্ষণ স্পষ্ট। কর্মসংস্থানের দাবিতে সোচ্চার যুবসমাজ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
এমনকি পরিবর্তনকামী মনোভাব, রাজ্যে কাজের সুযোগের অভাব এবং হিন্দু ভোট মেরুকরণের কারণে মমতার দীর্ঘদিনের সমর্থক গ্রামীণ হিন্দু নারী ভোটারদের মধ্যেও ফাটল দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের খুব স্বল্প ব্যবধানের জয় ভারতের বিরোধী জোট এবং খোদ পশ্চিমবঙ্গের জন্য খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে।
এটি ক্ষমতায় মমতার অবস্থানকে নড়বড়ে করে দেবে এবং তার দলের বিধায়কদের অন্য দলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। পাশাপাশি কেন্দ্রের বিপরীতে তার দরকষাকষির ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চতাও হ্রাস পাবে।
এর ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে ঐক্য গড়তে হিমশিম খাওয়া জাতীয় পর্যায়ের বিরোধীদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা যেমন কঠিন হবে, তেমনি ২০২৯ সালের লড়াইয়ের জন্য বিজেপিকে আরও উজ্জীবিত করে তুলবে।
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া থেকে নেওয়া