ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আন্তর্জাতিক নৌ বাণিজ্য গোষ্ঠীগুলো। ওই রুট কতটা নিরাপদ, সেটি যাচাই করছে তারা। শিপ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, এখনো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের আনাগোনা খুবই সীমিত।
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি ফের উন্মুক্ত করার বিষয়টি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। যদিও তিনি সতর্ক করেছেন, জাহাজগুলোকে অবশ্যই ইরানের নির্ধারিত ‘নিরাপদ লেন’ বা পথই ব্যবহার করতে হবে। এক্সে আরাঘচি লেখেন, ‘লেবাননের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, ইরানের বন্দর ও নৌ সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত সমন্বিত পথে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।’
পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কেবল নির্ধারিত রুট দিয়েই চলাচল করতে হবে। তবে সামরিক কোনো জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। ধারণা করা হচ্ছে, এটি সেই মানচিত্র এবং দুটি রুটের দিকে ইঙ্গিত করছে, যা গত সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
এদিকে হরমুজ প্রাণালি উন্মুক্ত করার এই ঘোষণাকে ‘বিশ্বের জন্য একটি মহান ও উজ্জ্বল দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ রুটটি কার্যত বন্ধ রেখেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তের ঘোষণা দিলেও বিষয়টি নিয়ে খোদ ইরানের ভেতরেই বিতর্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আইআরজিসি সমর্থিত তাসনিম নিউজ এজেন্সি আরাঘচির এই ঘোষণাকে ‘খারাপ ও অসম্পূর্ণ’ বলে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকা অবস্থায় এই ধরনের ঘোষণা ‘কার্যকর নয়’।
এ ছাড়া ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন অবরোধ বজায় থাকলে হরমুজ প্রণালি ‘উন্মুক্ত থাকবে না’। সেই সঙ্গে গালিবাফ সম্প্রতি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া গালিবাফ ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘গত এক ঘণ্টায় সাতটি দাবি করেছেন এবং তার সবগুলোই মিথ্যা।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত চলবে। তিনি দাবি করেন, দুই পক্ষের মধ্যে বড় কোনো মতপার্থক্য নেই। ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কোনো স্থল বাহিনীর প্রয়োজন নেই, ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে একসঙ্গে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যদিও ট্রাম্পের এই দাবিকে তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘কোনো অবস্থাতেই’ এই ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার কোথাও হস্তান্তর করা হবে না।
বিশ্বের মোট জ্বালনি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াত করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনার জেরে এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। জ্বালানি ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজে সরাসরি হামলার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রপথে মাইন পুঁতে রাখার সতর্কতাও দিয়েছিল ইরান। যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। শুক্রবার আরাঘচির ঘোষণার পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও, প্রণালিটি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে ব্যবসায়িক মহলে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের প্রধান আর্সেনিও ডমিঙ্গুয়েজ বিবিসি ওয়ার্ল্ডের বিজনেস রিপোর্টকে জানিয়েছেন, নৌ বাণিজ্য শিল্পের জন্য আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘জাহাজগুলো চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি থাকবে না এবং এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রয়োজন।’
ডমিঙ্গুয়েজ আরও জানান, কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেলেও বিষয়টি পুরোপুরি যাচাই করা এখনো কঠিন। কারণ হামলার ভয়ে অনেক জাহাজই তাদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে রাখছে।
সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও এই ঘোষণাকে খুব একটা আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছে না। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কন্ট্রোল রিস্কসের মেরিটাইম সিকিউরিটি পরিচালক করম্যাক ম্যাকগারি বলেন, আরাঘচির ঘোষণা সত্ত্বেও তিনি খুব একটা আশাবাদী নন। বিবিসির ফাইভ লাইভ ড্রাইভকে তিনি বলেন, ‘ইরানের এই বিবৃতিতে পরিস্থিতি মোটেও বদলায়নি।’
মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি ও অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য সামনের দিনগুলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ম্যাকগারি আরও ব্যাখ্যা করেন, সমুদ্রের নিচে মাইন থাকার যে অন্তর্নিহিত হুমকি, তা এখনো পুরোপুরি বজায় রয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বেশ অস্পষ্ট’ বলে অভিহিত করেছেন।
এদিকে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শুক্রবার জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ সুরক্ষায় তার দেশ ও ফ্রান্স একটি বহুজাতিক মিশনের নেতৃত্ব দেবে। ৪৯টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর স্টারমার বলেন, এই মিশনটি হবে ‘সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও প্রতিরক্ষামূলক’। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, এই মিশনটি তখনই কার্যকর হবে, যখন ওই অঞ্চলে চলমান সংঘাত বা লড়াই পুরোপুরি বন্ধ হবে।