পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনা স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে পুনরায় বিমান হামলা শুরু করার কথা চিন্তা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রোববার হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার সঙ্গে আবারও বিমান হামলা চালানোর বিষয়টিও তার বিবেচনায় আছে।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোতে সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে অবরোধ শুরু করা হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্য দেশে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ‘বাধা দেবে না’। এখন এ অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। আর ইরানি সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কাছে তেহরান ‘নতি স্বীকার’ করবে না।
এদিকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস থেকে বিবিসিকে বলা হয়েছে, সব পথই খোলা রাখা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়ে ইরানের চাঁদাবাজি বন্ধ করেছেন। একই সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সব বিকল্প পথও খোলা রেখেছেন। ওয়াল স্ট্রিটকে যারা বলেছেন প্রেসিডেন্ট এরপর কী করবেন তারা স্রেফ অনুমান করে বলেছেন।’
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক পোস্টের পর হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা ছেড়ে যেতে চেষ্টা করা যেকোনো এবং সব জাহাজকে অবরোধ করবে।’
এদিকে ইসলামিক রেভুল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই নৌপথের কাছাকাছি আসা যেকোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
‘তারা এখন আলোচনায় ফিরলেও কিছু যায় আসে না’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আরেক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ‘কারণ ইরান তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক।’
এদিকে ওয়াশিংটন ডিসির কাছে মেরিল্যান্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরান যদি এখন আলোচনায় ফিরে না আসে, তাহলেও কোনো সমস্যা নেই।
পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার এক দিন পর ট্রাম্প বলেন, ‘তারা ফিরে আসুক বা না আসুক, আমার কিছু যায় আসে না। যদি তারা ফিরে না আসে, তাহলেও আমার কোনো সমস্যা নেই (আই এম ফাইন)।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র চায় এবং ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারা এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ‘তারা এখনো এটি চায় এবং গত রাতে তারা তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’
বাড়ছে জ্বালানির দাম
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা বা চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি বন্দরে অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর জ্বালানির বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৭.৫ শতাংশ বেড়ে ১০২.৩৭ ডলার হয়েছে।
গত সপ্তাহের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় এই যুদ্ধের ফলে এখন জ্বালানি সংকটকে আরও বাড়াবে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
‘কোনো হুমকির কাছে মাথা নত করবে না ইরান’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, পাকিস্তানে শান্তি আলোচনার সময় দুই পক্ষই চুক্তির ‘একদম কাছাকাছি’ ছিল, কিন্তু তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ, বারবার লক্ষ্য পরিবর্তন ও অবরোধের’ সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ইরানি স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে উপহাস করে লিখেছেন, ‘বর্তমান তেলের দাম দেখে আনন্দ করুন। এই তথাকথিত অবরোধের কারণে শিগগিরই আপনারা চার বা পাঁচ ডলারে গ্যাস পাওয়ার দিনগুলোর কথা ভেবে নস্টালজিক হয়ে পড়বেন।’
এর আগে ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে গালিবাফ বলেছেন, ইরান ‘কোনো হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না’।
ইরানি নৌবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির জলপথের দিকে এগিয়ে আসা যেকোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সে সময় থেকেই সাইবার হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করার কারণ দেখিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে ইরানি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এ পদক্ষেপের কারণে তথ্য আদান-প্রদানে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে এবং যারা ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে নিজেদের ও পরিবারের ভরণ-পোষণ করেন, তারা সংকটের মুখে পড়েছেন।
ইরানে বর্তমানে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, তাদেরকে মোটামুটি দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একপক্ষ, যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং আরেকপক্ষ, যারা অধিক মূল্য দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন।
বিবিসি জানতে পেরেছে, প্রথম দলে রয়েছে মূলত সরকারি কর্মকর্তা, সরকার সমর্থক ব্যবহারকারী, সাংবাদিক এবং সম্প্রতি কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা ইন্টানেট ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছেন। অনুমোদিত সিম কার্ড বা প্রাতিষ্ঠানিক এক্সেসের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন এই দল।
আরেকপক্ষ মূলত সাধারণ নাগরিক, যারা স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা এর মাধ্যমে পরিচালিত সংযোগ ব্যবহারের জন্য প্রচুর টাকা খরচ করছেন। ইরানে স্টারলিংক ইন্টারনেটের দাম প্রতি গিগাবাইট প্রায় ছয় ডলার। এ অর্থ ইরানের নাগরিকদের জন্য অনেক বেশি, কারণ সেখানে একজন ব্যক্তির গড় মাসিক বেতন ২০০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে। আবার ইরানে স্টারলিংক ব্যবহারকারী একজন ব্যক্তির দুই বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ শত শত স্টারলিংক ডিভাইস জব্দ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।