দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, এতে এক মাসেরও বেশি সময়ের সংঘাত থামার আশা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে সময় বেঁধে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না হলে বড় হামলা হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’ এতে ইরানে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ রাতভর উদ্বেগে ছিলেন।
তবে আলটিমেটামের সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা তাৎক্ষণিক কার্যকর হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন মানার আহ্বান জানান।
যুদ্ধবিরতির পর উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করেছে। ইসরায়েলও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন দিয়েছে। যুদ্ধ থামানোর জন্য ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১০টি শর্ত তুলে ধরা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। অন্যদিকে ট্রাম্প গত মাসেই ১৫টি শর্ত তুলে ধরে সেগুলো মেনে নেওয়ার জন্য ইরানের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক কোন শর্তগুলোতে তারা একমত হয়ে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেন?
ইরানের ১০ শর্ত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার আগে ইরানের পক্ষ থেকে কাছে ১০টি শর্ত উপস্থাপন করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।’
ইরানের সরকারি গণমাধ্যমে যে ১০টি শর্ত তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো হলো:
১. ইরানে ফের হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা প্রদান।
২. হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকা।
৩. ইরানে পরমাণু সমৃদ্ধিকরণের অনুমতি প্রদান।
৪. ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
৫. ইরানের ওপর থেকে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
৬. ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া সকল প্রস্তাব প্রত্যাহার।
৭. আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রস্তাবগুলোও বাতিল করা।
৮. ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
৯. মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার।
১০. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা।
ইরানের গণমাধ্যমের দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্ত মেনে নিয়েছে। যদিও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে যে উভয়পক্ষ রাজি হয়েছে, সে বিষয়ে বিবিসি নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রতিবদ্ধ হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে।
ইরানে যতটুকু পরমাণু সমৃদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলো ‘যথোপযুক্তভাবে দেখভালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর এএফপিকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘সেটা নাহলে আমি মীমাংসা করতাম না।’
তবে ইরানের ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি। যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে চীনও ভূমিকা রেখেছে বলে জানতে পেরেছেন ট্রাম্প।
কী আছে ট্রাম্পের পরিকল্পনায়?
এদিকে মার্চের শেষ দিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়ে সেগুলো মেনে নেওয়ার জন্য ইরানের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ইরান তখন সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্ত যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইরান সরকারের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। সেখানে ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের সেই পরিকল্পনাটি প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা যাচ্ছে, সেখানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইরানের নেতারা ট্রাম্পের দাবিগুলোকে ‘বাড়াবাড়ি’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের শর্তের জবাবে পরে যুদ্ধের ‘স্থায়ী অবসানে’র লক্ষ্যে ১০ দফার প্রস্তাবটি পাঠায় তেহরান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরানের দেওয়া শর্তগুলো নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা হবে।
অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও আলোচনার জন্য’ ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে একটি বৈঠক ডেকেছে পাকিস্তান। সেখানে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদলকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শেহবাজ শরিফ। ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে আশাকরি, ইসলামাবাদ আলোচনা টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে এবং সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়ে আরও সুসংবাদ জানাতে চাই।’
যদিও আলোচনাটি শেষ পর্যন্ত তাতে কতটা সফলতা আসবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে এরকম আলোচনা হতে দেখা গেলেও মতানৈক্য না হওয়ায় শেষপর্যন্ত তা সামরিক উত্তেজনায় গড়াতে দেখা গেছে।
আলোচনা ভেস্তে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে আবার ইরানের হামলা চালাবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এএফপিকে বলেন, ‘সেটা আপনারা (সামনে) দেখতে পাবেন।’