জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং তেহরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বুধবার (১ এপ্রিল) ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরান যুদ্ধ ‘হয়তো দুই সপ্তাহের মধ্যে’ শেষ হতে পারে।
এদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আভাস দেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই তিনি এই যুদ্ধ শেষ করতে পারেন।
এমনটা হলে বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যার দায়ভার মূলত তার প্রশাসনের ওপরই বর্তাবে।
এর আগে মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের দাবি ছিল, তারা যেন ‘নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করে’।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সামরিক সহায়তার আহ্বান মিত্ররা উপেক্ষা করায় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এটিকে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তার মন্তব্য ছিল এমন, ‘আমরা এর (ইরান যুদ্ধ) সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখব না’; যা যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে আসার সম্ভাব্য ইঙ্গিত দেয়।
ধরে নেওয়া যাক, এটিই সত্যি। যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরতে এবং হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগবে।
এর কারণ, তেলের বাজারে যেকোনো সংকটের প্রভাব পড়তে অন্তত দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। অর্থাৎ, বর্তমানে জাহাজগুলো আটকে থাকলেও তার আসল ধাক্কা বা তেলের তীব্র সংকট আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাধারণ মানুষকে সইতে হবে।
সহজভাবে বললে, সমুদ্রের মাঝপথে আজ তেলের ট্যাংকারগুলো আটকে গেলেও আপনার শহরের পাম্পগুলোতে তেল ঠিকই বিক্রি হচ্ছে। কারণ এক মাস আগে তা বন্দরে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আজ যে জাহাজটি হরমুজে আটকাল, তার প্রভাব টের পাওয়া যাবে ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর, যখন আগে মজুত করা তেল শেষ হয়ে যাবে।
স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে অন্তত দুই সপ্তাহ
বহুজাতিক আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাককুয়ারি গ্রুপের বিশ্লেষক বিকাশ দ্বিবেদী বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সম্ভবত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। উৎপাদন পুনরায় শুরু করার আগে আপনাকে জমা হয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল জাহাজে তুলতে হবে। আর উৎপাদন আগের অবস্থায় ফেরাতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।’
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্নির্মাণে আরও বেশি সময় লাগবে বলে সতর্ক করেন দ্বিবেদী; যেখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও অস্পষ্ট।
দ্বিবেদী ইয়াহু ফাইন্যান্সকে বলেন, ‘কিছু কাজ খুব দ্রুত হবে। ড্রোন হামলায় হওয়া কিছু ক্ষতি—যেমনটি আমরা ইউক্রেনে দেখেছি—কয়েক দিন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে মেরামত করা সম্ভব। কিন্তু অন্যান্য ক্ষতির বিষয়ে আমরা এখনও নিশ্চিত নই।’
‘যদি কোনো বড় তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেটি মেরামত করা একটি বিশেষ প্রকল্পের মতো হতে পারে, যা শেষ করতে কয়েক মাস, এমনকি এক বছরও লেগে যেতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।
যুদ্ধোত্তর মাইন ও পরিচ্ছন্নতার চ্যালেঞ্জ
সমুদ্র থেকে মাইন পরিষ্কার করার মতো লজিস্টিক বিষয়গুলো এই সময়সীমাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, যা একটি বিপজ্জনক এবং সময়সাপেক্ষ কাজ।
গত মার্চের শুরুতে রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরান তাদের সবচেয়ে সংকীর্ণ চ্যানেলটিতে (যা মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত) বেশ কিছু মাহাম-৩ এবং মাহাম-৭ মাইন মোতায়েন করেছে।
এই চ্যানেলে মাত্র দুটি নির্ধারিত শিপিং লেন রয়েছে, যার প্রতিটি ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং মাঝখানে একটি বাফার জোন আছে।
এ ছাড়া হামলায় বিধ্বস্ত হওয়া জাহাজগুলোর ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তাও এই প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে।
জাহাজ ভাড়ার চ্যালেঞ্জ
আরেকটি বড় বিষয় হলো বিশাল তেলবাহী জাহাজগুলোর চার্টার রেট বা দৈনিক ভাড়া। উপসাগরীয় রপ্তানি কেন্দ্রগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল আনার জন্য শোধনাগারগুলো এই জাহাজগুলো ভাড়া করে।
চলমান লড়াইয়ের কারণে এই ভাড়া দৈনিক ৪ লাখ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি গত মার্চ মাসের শুরুতে ভারতগামী একটি ট্যাংকারকে প্রতিদিন ৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার ভাড়া দিতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
নরওয়েভিত্তিক রাইস্টাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এরিক গ্রুন্ডট দ্য হিন্দুকে বলেন, ‘এটি অবিশ্বাস্য রকমের উচ্চ হার। গত বছর ১ লাখ ডলার বা তার বেশি ভাড়া হলেই আমরা তাকে শক্তিশালী বাজার বলতাম।’
গ্রুন্ডট আরও জানান, চার্টার রেট শিপিং খরচের একটি অংশ মাত্র। অন্যান্য খরচ যেমন জ্বালানি, বন্দর শুল্ক এবং ক্যানাল কস্ট (কৃত্রিম খাল বা জলপথ ব্যবহারের জন্য জাহাজগুলোকে যে মাশুল বা টোল দিতে হয়) মিলিয়ে প্রতিদিন আরও ৫০ হাজার ডলার যোগ হতে পারে।
যুদ্ধ এবং হরমুজ অবরোধের কারণে অস্বাভাবিক হয়ে ওঠা শিপিং রেট থিতু হতে সময় লাগবে।
এর জন্য বিশাল তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল এবং লোডিং কার্যক্রমের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক বিমার পুনর্নির্ধারণ এবং আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ঘুরে যাওয়ার লজিস্টিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে এতে দুই থেকে চার সপ্তাহ, এমনকি ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে এটি কেবল একটি 'সেরা পরিস্থিতির' কল্পনা।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি