সিএনএনের বিশ্লেষণ
দুই দশকেরও বেশি সময় আগে যখন ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে জানাজানি হয়, তখন তেহরান জোর দিয়ে বলেছিল, তাদের উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ এবং অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। এমনকি দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি ফতোয়াও জারি করেছিলেন।
তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে তার মৃত্যুর পর ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সেই ফতোয়া পুনর্বিবেচনা করার পথ প্রশস্ত হতে পারে। ইরানের জনমত এবং রাজনৈতিক আলোচনা এরই মধ্যে সেই দিকে মোড় নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের ত্রিতা পারসি সিএনএনকে বলেন, ‘পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে ফতোয়া এখন মৃত। এ বিষয়ে ইরানের অভিজাত শ্রেণি এবং সাধারণ মানুষের মতামত নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আলোচনার মাঝপথেই দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ইরানকে দুবার বোমা মেরেছে।’
সাবেক ওবামা প্রশাসনের করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে আসার পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অনুমতি দেওয়ার অভ্যন্তরীণ চাপকে বছরের পর বছর ধরে প্রতিহত করে আসছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান শত্রুতার মুখেও খামেনি তার ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতিতে অটল ছিলেন। তিনি ইরানকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, যা বোমা তৈরির স্তরের কাছাকাছি পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সেই সীমা অতিক্রম করেনি।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান ‘অস্পষ্ট’
২০২৫ সালে ইরানের বেশ কয়েকজন সামরিক ও শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের পর পরমাণু বোমা তৈরির দাবি আরও জোরালো হয়। সেসময় ট্রাম্প ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার নির্দেশ দিলে সেই দাবি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এমনকি ওই হামলার আগেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করেছিল, তেহরান তাদের পরমাণু বোমা নিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করতে প্রস্তুত।
এর আগে ২০২৪ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আইআরজিসি কমান্ডার আহমদ হাকতালাব বলেছিলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক নীতি ও মতবাদ পরিবর্তন করা এখন খুবই সম্ভব এবং বোধগম্য।’
ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়নি। তবে তাদের কাছে বর্তমানে ৪০০ কেজিরও বেশি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যদি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ফতোয়া বাতিল করেন, তাহলে ইরান অনায়াসেই বেশ কয়েকটি পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারবে।
মোজতবা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন, যা তার শারীরিক অবস্থা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে জল্পনা তৈরি করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসি দেশটির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছে।
নতুন নেতৃত্বে পারমাণবিক নীতি পরিবর্তন হবে কি না—এমন প্রশ্নে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চলতি মাসে আল জাজিরাকে জানান, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে নতুন সর্বোচ্চ নেতার ‘আইনি বা রাজনৈতিক অবস্থান’ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, এটি আগের নীতির চেয়ে খুব বেশি আলাদা হবে না। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’
‘সংযমের কারণ নেই’
নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির প্রথম বার্তাটি ছিল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একজন সংবাদ উপস্থাপকের মাধ্যমে পড়া এক বিবৃতি। এতে তিনি তার বাবার এবং যুদ্ধে নিহত অন্যদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করলেও পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো উল্লেখ করেননি।
ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের অভ্যন্তরীণ চাপ মোকাবিলা করছে। আইআরজিসি ক্ষমতা সুসংহত করার পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কট্টরপন্থী কমান্ডারদের পুনরায় নিয়োগ দিচ্ছে, যারা তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ইরানের কট্টরপন্থী ভাষ্যকার নাসের তোরাবি এই মাসে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি। এই যুদ্ধের পর ইরান একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত হবে। আমাদের অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এ বিষয়ে ‘ইরান অ্যান্ড দ্য বোম্ব: দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, ইরান অ্যান্ড দ্য নিউক্লিয়ার কোয়েশ্চেন’ গ্রন্থের লেখক সিনা আজোদি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের সুযোগ দেখছে ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং আইআরজিসি। আগে তারা ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ভয়ে পারমাণবিক সংযম দেখাত। কিন্তু এখন যখন তারা আক্রান্ত হয়েই গেছে, তখন তাদের সামনে সব পথই খোলা। এই যুদ্ধ সবকিছু মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে, কারণ দেশটি প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে।’