যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন তাদের অভিযান ‘এপিক ফিউরির’ অধীনে ইরানে বিধ্বংসী বিমান হামলা শুরু করে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা করেছিলেন, তেহরানে ভেনেজুয়েলার মতো সরকার পরিবর্তন ঘটবে।
কিন্তু যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষ নেতৃত্বের বেশ কয়েকজনকে হারানো সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে তারা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার উৎস হলো তাদের সামরিক বাহিনীর 'মোজাইক ডিফেন্স' কৌশল। এটি বছর দশেক আগে তৈরি করেছিলেন ইরানি সমরবিদ মোহাম্মদ আলী জাফারি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই প্রতিরক্ষা কৌশলকে ‘আমাদের পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরাজয়ের ওপর দুই দশকের গবেষণার ফসল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর আরাগচি বলেন, ‘আমরা সেই অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করেছি। আমাদের রাজধানীতে বোমা হামলা হলেও যুদ্ধ করার সক্ষমতায় তার কোনো প্রভাব পড়বে না। মোজাইক ডিফেন্স আমাদের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় যে—কখন এবং কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ হবে।’
‘মোজাইক ডিফেন্সের’ কারিগর
ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’-এর স্থপতি হিসেবে পরিচিত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জাফারি দেশটির একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা; যিনি ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান ছিলেন।
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর জাফারি আইআরজিসির একটি গোয়েন্দা ইউনিটে যোগ দেন এবং কুর্দিস্তান প্রদেশে কর্মরত ছিলেন।
তিনি বছরের পর বছর ধরে ইরানের সামরিক নীতি পুনর্গঠন করেন, যাতে শীর্ষ নেতৃত্বকে হারানোর পরেও দেশ লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
জাফারি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন এবং আইআরজিসিতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পান।
১৯৯২ সালে তিনি আইআরজিসির স্থলবাহিনীর প্রধান হন এবং একই সঙ্গে আইআরজিসির অভিজাত ‘সারাল্লাহ’ ইউনিটের দায়িত্ব পান।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সংস্থা ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সালে জাফারি আইআরজিসির স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক নিযুক্ত হন। সেখানে তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক আক্রমণের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ তৈরি করেন।
২০০৭ সালে আইআরজিসির প্রধান হওয়ার পর তিনি এই কৌশল বাস্তবায়ন করেন, যা আজ পর্যন্ত মার্কিন বা ইসরায়েলি বাহিনী ভেদ করতে পারেনি।
‘মোজাইক ডিফেন্স’ আসলে কী
‘মোজাইক ডিফেন্স’ হলো এমন এক সামরিক ধারণা, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোকে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের বদলে একাধিক আঞ্চলিক এবং আধা-স্বাধীন স্তরে ভাগ করা হয়।
এর উদ্দেশ্য—প্রধান কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়ে যাতে পুরো ব্যবস্থাকে অচল করা না যায়।
এই মডেলে আইআরজিসি, বাসিজ বাহিনী, নিয়মিত সেনাবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, নৌবাহিনী এবং স্থানীয় কমান্ডগুলো একটি বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। যদি একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে অন্যগুলো সচল থাকবে। এমনকি শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও পুরো চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়বে না।
আইআরজিসিকে ৩১টি প্রাদেশিক কমান্ডে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি কমান্ড একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক ইউনিট হিসেবে কাজ করে, যাদের নিজস্ব অস্ত্র, গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং কমান্ড কাঠামো রয়েছে।
শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ও কাজ করতে পারে।
ইরানি সামরিক সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল কনাল বলেন, এই কাঠামোটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করার যেকোনো চেষ্টা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
কৌশলের প্রধান দুটি লক্ষ্য
‘মোজাইক ডিফেন্সের’ প্রধান লক্ষ্য দুটি। প্রথমত, কমান্ড সিস্টেমকে এমন করা যাতে শক্তি প্রয়োগ করে তা ধ্বংস করা না যায়।
দ্বিতীয়ত, রণক্ষেত্রকে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল করে তোলা—যেখানে নিয়মিত প্রতিরক্ষা, অনিয়মিত যুদ্ধ এবং স্থানীয় প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়া হয়।
এই কৌশল ধরে নেয়, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান হয়তো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে, কিন্তু তাদের আঞ্চলিক ইউনিটগুলো সচল থাকবে এবং স্বাধীনভাবে লড়বে।
এই রণকৌশল ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপরও নির্ভরশীল, যারা সম্মিলিতভাবে 'প্রতিরোধের অক্ষ' নামে পরিচিত।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হওয়া এক হিজবুল্লাহ সদস্য স্বীকার করেছিলেন, তিনি একটি ‘স্লিপার সেলের’ (গোপন গোষ্ঠী বা দলকে বোঝায়, যারা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য শত্রু বা লক্ষ্যবস্তু এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে থাকে) অংশ ছিলেন, যাদের নির্দেশ দেওয়া ছিল—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে তাদের সক্রিয় হতে হবে।
ইরান কেন এই মডেল বেছে নিল
২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের ধাক্কা থেকেই এই কৌশলের জন্ম।
ইরাকে সাদ্দাম হোসেন সরকারের দ্রুত পতন ইরানের কৌশলবিদদের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।
তেহরান তখন সিদ্ধান্ত নেয়, সামরিক বাহিনীকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল না রেখে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি