দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা দক্ষিণ চীন সাগর থেকে একটি বিমানবাহী রণতরী বহর মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেন।
চলতি সপ্তাহে পেন্টাগন এশিয়া থেকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে নিচ্ছে, যাতে ইরানের ড্রোন ও রকেটের বিরুদ্ধে সুরক্ষা আরও জোরদার করা যায়।
স্থানান্তর করা এই অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা থাড সিস্টেমের ইন্টারসেপ্টর।
দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ায় একমাত্র মিত্র দেশ, যেখানে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় পেন্টাগন এই উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এই প্রথম ওই ইন্টারসেপ্টরগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কূটনৈতিক ও লজিস্টিক বিষয়গুলো সমাধান হলে এর লঞ্চারগুলোও সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহ হলো। কিন্তু এর মধ্যেই এই যুদ্ধ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তার আশ্বাসকে সংকটে ফেলেছে। অথচ মার্কিন সামরিক নেতারা এতদিন ওই অঞ্চলকে তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করে আসছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান যুদ্ধ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে দুর্বল করবে, দেশটির পতন নিয়ে চীনের যুক্তিগুলোকে জোরালো করবে এবং মাঝারি শক্তির দেশগুলোর মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করবে।
এদিকে যুদ্ধের রসদ ও সরঞ্জামের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া মধ্যপ্রাচ্যে বিমান, সামরিককর্মী এবং আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে।
জাপান ও তাইওয়ান তাদের ফরমায়েশ দেওয়া অস্ত্রের সরবরাহ পেতে দেরি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলছে।
গত মঙ্গলবার পেন্টাগন কর্মকর্তারা কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, তাদের হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই খরচের পরিমাণ ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, তারা অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন অঞ্চলে মোতায়েন করা অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া নিয়ে চিন্তিত; যা অনেকগুলো অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলছে।
এশিয়ায় মার্কিন মিত্ররা এই ঘাটতি তীব্রভাবে অনুভব করছে। কারণ তারা চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং ওই অঞ্চলে তাদের আগ্রাসী তৎপরতা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং গত মঙ্গলবার তার মন্ত্রিসভাকে বলেন, ‘পেন্টাগনের এই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তার সরকার দ্বিমত পোষণ করলেও, এটিও এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে এ বিষয়ে আমাদের সবসময় নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী চলার উপায় থাকে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে তিনটি প্রাথমিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে এশিয়া—
১. এশিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার নয়
গত বছর সিঙ্গাপুরে এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জোর দিয়ে বলেছিলেন, তার দেশ এশিয়া অঞ্চলেই মনোনিবেশ করবে।
তিনি বলেছিলেন, ‘ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র ও অংশীদারদের প্রতি আমেরিকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কারো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আমরা আমাদের বন্ধুদের আগলে রাখা অব্যাহত রাখব।’
এখন অনেক দেশের পক্ষেই এই কথা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রয়োজনে উত্তর কোরিয়ার মতো একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সীমান্তবর্তী মিত্র রাষ্ট্র থেকে বিশেষ সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাইডেন প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তাবিষয়ক সাবেক সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব এলি র্যাটনার বলেন, ‘কোরিয়া থেকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া এমন এক সময়ে খুব খারাপ সংকেত দিচ্ছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের এশিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে সিউলে এমনিতেই ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে।’
থাড ব্যাটারি হলো মার্কিন অস্ত্রাগারের শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। প্রতিটি ব্যাটারিতে সাধারণত ট্রাক-চালিত বেশ কয়েকটি লঞ্চার এবং সুনির্দিষ্ট রাডার সিস্টেম থাকে, যা যেকোনো উচ্চতায় আগত ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে এ ধরনের অন্তত পাঁচটি সিস্টেম রয়েছে। এশিয়ায় থাড লঞ্চারগুলো প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ গুয়াম ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা হয়েছিল।
র্যাটনার উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে সিউলের কাছে থাড বসানোর পর চীন দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্য বর্জন এবং দেশটিতে পর্যটন নিষিদ্ধ করে প্রতিশোধ নিয়েছিল।
চীনের যুক্তি ছিল, এই সিস্টেম তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
র্যাটনার বলেন, ‘এখন সেই সিস্টেমটিই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জন্য সরিয়ে নিচ্ছে।’
২. প্রভাব ও আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে যাবে চীন
অর্থনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে জড়িত। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এশিয়া এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। কারণ এই অঞ্চল বিশ্বের প্রধান শিল্প উৎপাদন কেন্দ্র। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে তাদের প্রয়োজনীয় তেলের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করতে হয়।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতে ব্যাপক ধস দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের রেশনিং ফিলিপাইনের মতো মার্কিন মিত্রদের ওপর কঠোর আঘাত হানছে। আর এটিই বেইজিংকে সুযোগ করে দিচ্ছে।
এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই আপাত উদাসীনতাকে বেইজিং এখন তাদের স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—চীনই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পরাশক্তি।
এই যুদ্ধ চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করার প্রচুর সুযোগ করে দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না ডেইলি গত মঙ্গলবার একটি কার্টুন প্রকাশ করেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে ‘আঙ্কেল স্যাম’ একটি ঘন মাকড়সার জালে আটকা পড়েছেন। এর শিরোনাম ছিল—‘মধ্যপ্রাচ্যে আটকা পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।’
এশিয়ার কূটনীতিকরা আশঙ্কা করছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বেইজিং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে আরও বেশি সুযোগ পাবে। যদিও তারা তাইওয়ানের আশপাশে সামরিক উড্ডয়ন বর্তমানে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
তবে চীনের নৌবাহিনী সেখানে এবং অন্যত্র বেশ সক্রিয় রয়েছে।
৩. অস্ত্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা যাচ্ছে না
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া এটিই প্রমাণ করছে, মার্কিন যুদ্ধযন্ত্রের গভীরতা অনেকের ধারণার চেয়েও কম। সামরিক হিসাব-নিকাশ অনেক মার্কিন অংশীদারকে আতঙ্কিত করছে।
প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের খরচ প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালজুড়ে মোটে ৬০০টি এমন মিসাইল তৈরি করেছে। অথচ কিছু অনুমান বলছে, যুদ্ধের মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে ১ হাজারটিরও বেশি মিসাইল ব্যবহৃত হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর আরও অনেক সম্পদ রয়েছে। আমেরিকান বিমান হামলাগুলো এখন তুলনামূলক সস্তা এবং প্রচুর পরিমাণে থাকা বোমার দিকে ঝুঁকছে।
এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের সঙ্গে করা এক চুক্তির লক্ষ্য ছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের উৎপাদন তিন গুণ করা।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে যেসব দেশ মার্কিন অস্ত্র কিনতে সামরিক বাজেট বাড়িয়েছিল, তাদের কাছে ইরান যুদ্ধ সতর্কসংকেত হয়ে এসেছে।
তারা বুঝতে পারছে, তারা যা কিনছে তা হয়তো শিগগিরই হাতে পাবে না।
গত জানুয়ারিতে জাপান সরকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১১৮টি মার্কিন অস্ত্রের ফরমায়েশ চুক্তি স্বাক্ষরের পাঁচ বছর পরও সরবরাহ করা হয়নি।
তাইওয়ান আশঙ্কা করছে, ইরান যুদ্ধ বিদ্যমান পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করবে। গোলাবারুদের সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দুর্বল হবে এবং তাইওয়ান সরকারের পক্ষে মার্কিন অস্ত্র কেনার জন্য বড় প্রতিরক্ষা বাজেট ঘোষণা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর এই উদ্বেগ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে পেন্টাগন এক সংক্ষিপ্ত ই-মেইলে বলেছে, ‘আমাদের দেওয়ার মতো কিছু নেই।’