বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোথাও জ্বালানি রেশনিং চালু করা হয়েছে, কোথাও কর কমানো হয়েছে, আবার কোথাও বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
মিয়ানমারে জ্বালানি সংকট তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। দেশজুড়ে পেট্রোল স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, এমনকি তাপজনিত ক্লান্তিতে তিনটি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
শুধু মিয়ানমার নয়, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত প্রায় এক মাস ধরে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে এবং অনেক জায়গায় পেট্রোল স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাব কমাতে বিভিন্ন সরকার করছাড়, জ্বালানির কোটায় শিথিলতা ও খরচ কমানোর মতো নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
কেনিয়ায় জ্বালানি সংকটে বাণিজ্যে প্রভাব পড়ায় সরকার পচনশীল পণ্যের রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফুল, অ্যাভোকাডো ও সবজির মতো তাজা পণ্য দ্রুত রপ্তানি নিশ্চিত করতে বন্দর কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে দেশটির ফুল শিল্প ইতোমধ্যে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। চা চাষি ও রপ্তানিকারকরাও উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
পাশের দেশ ইথিওপিয়ায় সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছে এবং জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে।
নাইজেরিয়ায় পেট্রোলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় সরকার বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু যানবাহনকে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজিচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছেন। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত গাড়ি রূপান্তর কিট বিতরণ এবং মোবাইল রিফুয়েলিং ইউনিট চালুর কথাও বলা হয়েছে, যাতে সিএনজির সহজলভ্যতা বাড়ে।
ভিয়েতনাম জ্বালানির ওপর পরিবেশ কর সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছে, যাতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সরকার বলছে, জাতীয় স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে দেশটি নাগরিক ও সরকারি কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে কাতার, কুয়েত, আলজেরিয়া, জাপানসহ কয়েকটি দেশের কাছে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বিষয়ে একটি চুক্তিও সই হয়েছে।
মিয়ানমারে সামরিক সরকার জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি কেনা যাবে এবং বারকোড ও কিউআর কোডের মাধ্যমে বরাদ্দ ট্র্যাক করা হবে। সরকারি দপ্তরগুলোতে সপ্তাহে এক দিন বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ব্যবস্থা নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে থাইল্যান্ডের কিছু এলাকায় ইতোমধ্যে ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংককের বাইরে অনেক পেট্রোল স্টেশনে ডিজেল শেষ হয়ে গেছে, যা পরিবহন, কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি মজুত ব্যবহার, ২৪ ঘণ্টা পরিবহন চালু এবং সরকারি ভবনে জ্বালানি ব্যবহার কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি কর্মীদের হালকা পোশাক পরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরও স্থগিত করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে আরও অনেক দেশকে একই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।