বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে গড়ানোর বাকি মাত্র সাতদিন। কিন্তু মাঠের খেলা শুরুর আগেই বাংলাদেশের সম্প্রচার অঙ্গনে শুরু হয়েছে ভিন্ন এক লড়াই। দেশের কোটি-কোটি ফুটবলপ্রেমীর ঘরে বিশ্বকাপ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে, তা নিয়ে চলছে নীরব কিন্তু তীব্র দৌড়ঝাঁপ।
এই দৌড়ে আলোচনায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিটিভি। পাশাপাশি দেশের দুটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলও সম্প্রচার স্বত্ব কিংবা সাব লাইসেন্স পাওয়ার লক্ষ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশে বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি মানুষের আবেগের উৎসব। বিশ্বকাপ এলেই গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান থেকে অভিজাত ক্লাব! সবখানেই শুরু হয় ফুটবল উন্মাদনা। তাই বিশ্বকাপ সম্প্রচারের স্বত্ব পাওয়া শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়; এটি মর্যাদা, দর্শকসংখ্যা এবং বাজার দখলেরও বড় লড়াই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার নিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও বিটিভি এবং দুটি বেসরকারি টেলিভিশন এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব কেনার জন্য বিটিভিকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব অর্জন করলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিটিভি নির্দিষ্ট শর্তে সেই সম্প্রচার সুবিধা বিনামূল্যে পেতে পারে। বিটিভির মূল ভূমিকা হবে দেশের সাধারণ দর্শকের জন্য সম্প্রচার নিশ্চিত করা।
জানা গেছে, বিশ্বকাপ সম্প্রচারের বিষয়টি নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি কয়েক দফা বৈঠক করেছে। তাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশের বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দর্শকবান্ধব একটি সমাধানে পৌঁছানো।
সূত্রগুলো জানায়, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির দায়িত্ব প্রথমে দেওয়া হয়েছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানকে। কাতার বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতায় এবারও তুলনামূলক উচ্চ মূল্যে স্বত্ব বিক্রির চেষ্টা করা হয়। শুরুতে প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
তবে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজার, সম্প্রচার খাতের সক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক বাস্তবতা বিবেচনায় সেই মূল্যকে অনেকেই অযৌক্তিক মনে করেন। দীর্ঘ আলোচনা ও দেনদরবারের পর মূল্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলারে আলোচনার বিষয়টি সীমাবদ্ধ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তবে এই মূল্য নিয়েও আপত্তি রয়েছে সরকারের।
সংশ্লিষ্ট সুত্রের মতে, বাংলাদেশের বাজারকে ঘিরে যেসব অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিক চক্র সক্রিয় রয়েছে, সেগুলো থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি ও স্বচ্ছ উপায়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের ব্যবস্থা করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
ক্রীড়া সংগঠকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের মতো বিশাল ফুটবলপ্রেমী বাজারকে অন্য কোনো দেশের সম্প্রচার বলয়ের অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের জন্য আলাদা বাজারভিত্তিক মূল্যায়ন এবং স্বতন্ত্র সম্প্রচার কাঠামো নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
শেষ পর্যন্ত একাধিক প্ল্যাটফর্মে বিশ্বকাপ সম্প্রচার হলে দেশের দর্শকরা আরও সহজে খেলা উপভোগ করতে পারবেন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ কেবল ব্যবসার পণ্য নয়; এটি মানুষের আবেগের অংশ। তাই বাংলাদেশের দর্শকের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে উন্মুক্ত ও সহজ সম্প্রচারের পথ খোঁজাই এখন সবচেয়ে জরুরি।