অনিয়ম অনিঃশেষ-৯
মাদারীপুর জেলার টেকেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শত একর সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। জেলার রাজৈর উপজেলার ২৮ নম্বর নাগরদী মৌজায় বিআরএস ৪১৮৩ নম্বর দাগ, যা বিআরএস ৪ নম্বর খতিয়ানের জমিটি পাউবোর নামে রেকর্ডভুক্ত সম্পত্তি তথা সরকারি সম্পত্তি। কিন্তু স্থানীয় শহীদ শেখের নেতৃত্বে একটি চক্র ওই সম্পত্তি ভোগদখল করছে। এ বিষয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক বরাবরেও। সরকারি সম্পত্তি খালি করার জন্য বারবার নোটিশ করা হলেও অদৃশ্য ক্ষমতার বলে বহাল তবিয়তে শহীদ শেখ চক্রের দখল বাণিজ্য।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৮ জানুয়ারি মোহাম্মদ শহিদ শেখ, সজিব শেখ এবং হান্নান মোল্লাকে টেকেরহাট পানি উন্নয়ন শাখার কর্মকর্তা উপ-সহকারী প্রকৌশলী নাহিদ মল্লিক ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তিতে অবৈধ দখল ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ’ করতে উচ্ছেদের চিঠি দেন। এছাড়া গত ২৭ এপ্রিল ওই তিনজনের নাম উল্লেখ করে একই ধরনের আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়। অপরদিকে, গত ২৮ জানুয়ারি পাউবোর সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করতে সার্ভেয়ায় ফরহাদ হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সরেজমিন পরিদর্শন শেষে দখলদারদের উচ্ছেদের ওই দুটি চিঠি পাঠান সার্ভেয়ায়।
ওই চিঠিতে বলা হয়, প্রথমবার নোটিশ দেওয়ার পরেও মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলাধীন সরকারি সম্পত্তিতে সেমিপাকা টিনশেড ঘর নির্মাণ এবং শ্রেণি পরিবর্তনের কাজ চালিয়ে যাওয়া আইনবহির্ভূত ও অবৈধ। এমতাবস্থায়, নির্মাণকৃত সেমিপাকা টিনশেড ঘর ও আসবাবপত্র দ্বিতীয় চিঠি ইস্যুর সাত দিনের মধ্যে সরিয়ে খালি করার জন্য অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় ভূমি ও ইমারত দখল বা পুনরুদ্ধার অধ্যাদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কিন্তু দফায় দফায় চিঠি দেওয়ার পরও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্পত্তিটি খালি না করে দখলে রেখে ভাড়া বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। ভূমি দখলেই সীমাবদ্ধ না থেকে রীতিমতো দোকান তৈরি করে পজিশন ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় একশ একর সম্পত্তি উদ্ধারে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ করে, ভূমিদস্যুদের হুমকির মুখে দিনাতিপাত করছেন অভিযোগকারীরা। তারা জানান, দখলদার বাহিনীর পেছনে রয়েছে বিশাল শক্তি, যার কারণে অবৈধভাবে সরকারি জমি দখল করে দোকানপাট, ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস এবং ভাড়া আদায় করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সরেজমিন তদন্ত করে তাদের উচ্ছেদের চিঠি দেয়। কিন্তু চিঠি দেওয়ার পরও ভূমিদস্যু শহীদ শেখ গংরা একের পর এক বসতি নির্মাণ করছে।
এসব ভূমি দখলের বিষয়ে স্থানীয় হোসেনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য কাজী তৈয়বুর রহমান নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘এখানে বহুত দোকান। হাজার হাজার দোকান, শুধু শহিদ শেখের একার নয়। হাজার হাজার লোকের দোকান আছে এখানে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গার সাথেই তাদের পৈতৃক সম্পত্তি, তা শহীদ শেখের জায়গা। ওই জায়গা নিয়ে মামলা চলছে হাইকোর্টে। এরা সবাই ওই জায়গা দখল করে ভোগদখল করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন ভাঙার সময় আসে, সরকার ভেঙে দেয়। তখন সবার ঘরই ভেঙে দেয়। তখন আর কারোরই কিছু করার থাকে না। এ পর্যন্ত সরকার দুইবার ভাঙছে।’
এসব বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে মাদারীপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজস্ব সার্ভেয়ার ফরহাদ হোসেন নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘ওই জমি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলছে। যারা দখল করেছে, ওটা ওদেরই পুরোনো জায়গা। ওই জায়গায় হাইকোর্টে মামলা চলাকালীন অবস্থায় কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করা যাবে না বলে মনে হয়। এছাড়া বাজেটও নেই। ডিসি অফিসে উচ্ছেদের তালিকা দেওয়া আছে, বাজেট আসলে হয়তো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।’
এসব সম্পত্তি দখলের বিষয় জানতে শনিবার দুপুর ৩টার দিকে পাউবোর পশ্চিমাঞ্চলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান সিরাজ নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। আমি তো ওখান থেকে চলে এসেছি, এখন ঢাকায় বসি। বিষয়টি আপনি বললেন, আমরা ব্যবস্থা নেব। আমরা উচ্ছেদের চেষ্টা করছি।’
এসব বিষয়ে মাদারীপুর জেলার পাউবোর প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ শনিবার (২০ জুন) দুপুর ৩টা ১০ মিনিটের দিকে নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘ওইখানে আরও অনেকগুলো স্থাপনা আছে। সবগুলোর তালিকা করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ হলে যৌথভাবে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে দেওয়া হবে।’
এদিকে শুক্রবার শহীদ শেখের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ওই সম্পত্তি তার পৈতৃক সম্পত্তি বলে দাবি করেন। তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটা মিথ্যা। ওইটা পৈতৃক সম্পত্তি। এইটা নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলমান। ওইটা আমার বাড়ি, আমার পৈতৃক সম্পত্তি। আপনাকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।’
আইন থাকলেও প্রয়োগ হচ্ছে না কেন, এই দখলদার বাহিনীর সঙ্গে তবে কি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেট জড়িত—এ নিয়েও প্রশ্ন এলাকাবাসীর।