বর্তমানে ‘উগ্রবাদ’ শব্দটির সংজ্ঞা বিকৃত করা হয়েছে মন্তব্য করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেছেন, যারা নামাজ পড়ে, দাড়ি রাখে ও মসজিদে যায়, তাদের উগ্রবাদী বলা হচ্ছে, যা সঠিক নয়। বরং যারা শৃঙ্খলা মানে না এবং আল্লাহ ও তার রাসূলকে মানে না, তারাই প্রকৃত উগ্রবাদী। আর যারা ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলে, তারা প্রকৃত মুমিন মুসলমান এবং তাদের দ্বারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোনো ক্ষতি হতে পারে।
ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের কবি নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামী আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে এসব কথা বলেন অলি আহমদ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
অলি আহমদ বলেন, দেশে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষকে মিথ্যা কথা শিখিয়ে দেওয়া হয়, যেন সেগুলো মুখস্থ করে বললেই দায়মুক্তি পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিচার বিভাগের অনেক ক্ষেত্রে বিচারকরা দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পান, যার ফলে নিয়ন্ত্রিত রায় আসে। এতে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং তাদের যাওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুরুর দিকে স্বাভাবিক থাকলেও সকাল ১০-১১টার পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে থাকে। ‘উগ্রবাদীদের ভোট দেওয়া যাবে না’—এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেন তিনি।
জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের পর ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ ইস্যু তৈরি করে দেশকে বিভক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, জিয়াউর রহমানের সময় তিনি নিজেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার মতে, দেশে বিভিন্ন মত ও পথ থাকলেও সেগুলো বিকাশের সুযোগ দিতে হবে, বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।
সরকারপ্রধানের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ বারবার আসে না। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রীর বাবা স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে এবং মা সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন। তাই বর্তমান নেতৃত্ব চাইলে সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেও ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারেন। তবে চারপাশের চাটুকারদের কারণে অনেক সময় সঠিক পথে পরিচালনা ব্যাহত হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দাবি করেন, ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চ রাতে বিদ্রোহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি উদ্যোগ না নিলে সে সময় বিদ্রোহ সংঘটিত হতো না এবং সংশ্লিষ্ট এক নেতাকে উদ্ধার না করলে তাকে হত্যা করা হতে পারত। তিনি আরও বলেন, তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের নথিতেও উল্লেখ রয়েছে, জিয়াউর রহমানের উদ্যোগেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়।
তিনি দাবি করেন, এসব ডকুমেন্ট আর্মি হেডকোয়ার্টারে সংরক্ষিত রয়েছে এবং প্রয়োজনে তিনি নিজ বাসায় থাকা মূল কপিও দেখাতে পারবেন। তার মতে, সত্যকে অস্বীকার করে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়।
এ সময় তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের ধারণা প্রথম দেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী, যার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্রোহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। তিনি বর্ণনা করেন, কীভাবে সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তা বিষয়টি জানতেন এবং কীভাবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এলডিপি চেয়ারম্যান বলেন, ২৭ মার্চ কালুরঘাটে একটি অস্থায়ী সম্প্রচারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করা হয় এবং ৩০ মার্চ আবার নতুনভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, সে সময় একটি অস্থায়ী মন্ত্রিসভাও গঠিত হয়েছিল, যেখানে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন এবং মেজর মীর শওকত আলী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা মেনে নিতে না পেরে কিছু সামরিক কর্মকর্তা—খালেদ মোশাররফ ও শফিউল্লাহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এর ফলে জিয়াউর রহমানকে দূরবর্তী এলাকায় পাঠানো হয় এবং তার বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
অলি আহমদ বলেন, তিনি নিজেই জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন এবং তুরা অঞ্চলে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেন। সেখানে তিনি একাধিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন এবং ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব না দিয়ে নিজেই দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনীতে তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়েও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিগেড মেজর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, যা তিনি পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগে নিশ্চিত করেন।
অলি আহমদ বলেন, সমাজে বৈষম্যের মূল কারণ হলো নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব। যারা আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশনা মানে, তারা কখনো বৈষম্য করে না। তিনি একটি ধর্মীয় বয়ানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে বড় সওয়াব অর্জন সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, তাদের লক্ষ্য কাউকে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং চোর, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় এনে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই তাদের উদ্দেশ্য।