শীতের সকালে চারদিক যখন সাদা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে, দূরের গাছপালা ঝাপসা হয়ে আসে, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এটা কি শুধুই কুয়াশা, নাকি তুষারপাত? পাশের দেশ ভারতের দার্জিলিংয়ে বরফ পড়লেও সমতল বাংলাদেশে কেন তার দেখা মেলে না, তা নিয়ে আমাদের কৌতূহলের শেষ নেই। এবারের শীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ঠান্ডা পড়েছে।
উত্তরের শেষ জেলা পঞ্চগড়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে এসেছে তাপমাত্রা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে কেন তুষারপাত হয় না? আদৌ কি তা এই দেশে সম্ভব?
মূলত ভৌগোলিক অবস্থান, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা এবং হিমালয় পর্বতমালার বিশেষ ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে তুষারপাতের মতো ঘটনা ঘটে না। বিজ্ঞানসম্মত কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তুষার কণা আকাশ থেকে ঝরলেও বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করার আগেই তা অন্য রূপে হারিয়ে যায়।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভৌগোলিক অবস্থান ও হিমালয়ের সুরক্ষা দেওয়াল তুষারপাত হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো তাপমাত্রা অবশ্যই শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকতে হবে এবং বাতাসে পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প থাকতে হবে। বাংলাদেশ একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশ হওয়ার কারণে এখানকার তাপমাত্রা সাধারণত হিমাঙ্কের নিচে নামে না।
উচ্চতার প্রভাব
উচ্চতা বাড়লে তাপমাত্রা কমে। দার্জিলিং বা হিমালয় অঞ্চল অনেক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে বরফ জমে, যা সমতল বাংলাদেশে সম্ভব নয়।
হিমালয়ের বাধা
সাইবেরিয়া থেকে আসা হাড়কাঁপানো শীতল বাতাস সরাসরি বাংলাদেশে ঢুকতে পারে না। হিমালয় পর্বতমালা এই বাতাসকে আটকে দেয়। পাহাড় পেরিয়ে যেটুকু বাতাস আসে, তা বাংলাদেশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেকটা উষ্ণ হয়ে যায়।
তুষার কীভাবে তৈরি হয়?
জলীয় বাষ্প হালকা বলে উপরে উঠে ধূলিকণার সাথে মিশে মেঘ তৈরি করে। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার উপরে ক্ষুব্ধমন্ডল, তাপমাত্রা অনেক কম থাকায় সেখানে তুষার কণা তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই কণাগুলো নিচে নামার সময় অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে এসে গলে গিয়ে বৃষ্টি বা কুয়াশায় পরিণত হয়।
‘মিনি আইস এজ’ ও বাংলাদেশের তুষারপাতের সম্ভাবনাবিজ্ঞানীদের মতে, এই দেশে তুষারপাত না হওয়ার প্রধান কারণ এখানকার তাপমাত্রা।
দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২০১৮ সালে তেঁতুলিয়ায়, যার মাত্রা ছিল ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা বরফ পড়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়। তবে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে।
সোলার মিনিমাম কী?
সূর্যের একটি নির্দিষ্ট চক্রের কারণে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবী একটি ‘ক্ষুদ্র তুষার যুগ’ বা ‘Mini Ice Age’-এর কবলে পড়তে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। সূর্যের তেজ কমে গেলে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা হ্রাস পায়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বাংলাদেশে তুষারপাত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
তবে, আজ থেকে প্রায় ৫০ হাজার বছর পর পৃথিবী যখন পূর্ণাঙ্গ তুষার যুগে প্রবেশ করবে, তখন মেরু অঞ্চলের বরফ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, সেই সুদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে গেলে বাংলাদেশের মতো সমতল অঞ্চলেও তুষারপাত হতে পারে।