২৪-এর ৪ আগস্ট অন্ধকার কারাগারে ছিলাম। হ্যাঁ, আমাকে একাই রাখা হয়েছিল এক রুমে, ভিপি নুরকে আমার থেকে একটু দূরে। আমাদের আর সব বন্দির সাথে মিশতে দেওয়া হত না। সবাই যখন বের হত, ভিপি নুর বা আমি ভিতরে থাকতাম। সবাই যখন ভিতরে থাকত সে বা আমি বের হতাম।
এবার আগস্ট তো চোখের সামনেই দেখছি। আমি আসলে ওই আগস্ট বা এই আগস্ট, কোনো আগস্টেই মৃত্যু, মারামারি চাইনি। আমার জীবদ্দশায় কাউকে থাপ্পর মারিনি। সেটা আমার সন্তানকেও না।
তবে ভীষণ নির্যাতনেও প্রতিবাদ চালিয়ে গেছি, যে বাঁশ হাতে রামপুরায় আন্দোলন শুরু করেছিলাম, তা আসলে একটা আহ্বান, ছাত্রহত্যা রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান।
এবার জুলাইয়ে যে সহিংসতা এটা শুরু করেছে আম্মার নামের রাবির ছেলেটা। সেদিন আম্মার মেরে বাহাদুরি করে বলল, মার দিয়েছে মার খাই নাই। আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তো আগে থেকেই উসকাচ্ছে।
ফারজানা নামের একটা মেয়ের বক্তব্যের জন্য আয়াস নামের একটা ছেলে দলবল নিয়ে গিয়ে থাপ্পড় মেরে আসল একা পেয়ে। আজ আবার সেই ছেলে হামলা করতে গিয়ে মেয়েটির মাথা ফাটিয়ে দিল, নিজেও মার খেয়ে ফিরল। তবে আয়াসের অসহায়ত্ব পুরুষ হিসেবে লজ্জা পাইয়ে দিচ্ছিল। মেয়েটি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আক্রান্ত হলো। রক্ত ঝরছে উভয়পক্ষের।
সারাদিন ছাত্রদল-শিবির মারামারি করল, এটা আমার ভালো লাগেনি একদম। সেসব কিছু ভুলিয়ে দিল আয়াস ফারজানার মারামারি।
আমার কাছে এই মুহূর্তে অ্যান্টি আওয়ামী শক্তিসমূহের মারামারি দেখে হতাশ লাগছে। এভাবে হওয়ার কথা ছিল না। যারা বলছিল কথার জবাবে মারামারি নয়, কথা দিয়ে হবে শুধু, তারাই আবার অন্য কাউকে কথার জন্য মারছে। আর নিজে মার খেলে ভিক্টিম সেজে কান্নাকাটি করছে।
পাটওয়ারী চোখে পট্টি লাগিয়ে নাটক করতে পারবে, স্লোগান দিতে পারবে হাজার হাজার চোখ দেওয়ার, বক্তব্য দেবে চোখ লাগলে চোখ দেব, তবুও তারেক রহমানের পদত্যাগ চাইব। কিন্তু নিজের চোখ বাদে সেটা বাকি বোকা যুবকদের চোখ।
আজ সারাদিন একটা লেখাও লিখিনি। আমি আসলে ভাবছিলাম কাল রাতের কথা, যখন ওরা বলছিল ক্যাম্পাস স্বাধীন করছে, ছাত্রদলকে ভাগিয়ে। জামায়াতের বোকা নেতাকর্মীরা উল্লাস করছিল, আমার বিশ্বাস জামায়াতের আমির বা একটু বুঝওয়ালা মানুষরা উল্লাস করছিল না, দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছিল।
বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতাটাকে নিজেদের মাঝে রাখতে চায় এভাবে যে, আমরা আমরাই যা খুশি করব, এখানে লীগ যেন না আসে। কিন্তু ক্যালকুলেশনের গতিপ্রকৃতি বলে দিচ্ছে, সবার জন্য বিপদ আসছে। আওয়ামী লীগের হারানোর কিছু নাই, বিএনপি তো শক্তি দিয়ে লড়াই করে একটা ইলাস্টিসিটি অর্জন করেছে। চেহারা প্রকাশ পাওয়া জামায়াত-শিবিরের ভাইগুলোর কী হবে সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।
লড়াই চলছে এই তত্ত্বে যে, বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্ব করবে, মিলে যাবে। এর মাঝে লীগ যেন না আসে৷ রাজনীতিতে আমার বুঝ যদি ঠিক হয়, লীগ যে কোনো এক পক্ষে যাবে, অপরপক্ষকে মাটির সাথে মিশে দিতে।
এ সবকিছুতে জনগণের কিছুই যায় আসে না। রাজনৈতিক দল যে যার মতো ব্রেনওয়াশ করবে, কিছু জনগণকে যে যার মতো পক্ষে নেবে, মারামারি করবে, এই আর কি।
জামায়াত যদি নির্বাচনে জিততো, তাহলে এক সপ্তাহের মাঝে এদের মনে যা রাগ-ক্ষোভ আছে প্রতিশোধ নিয়ে নিতো। এরপর রিভার্স চাপ আসতো ক্ষতিগ্রস্ত সব পক্ষ মিলে, আর জামায়াতকে ৭০ হাত মাটির নিচে ঢুকিয়ে দিতো এবং জামায়াত সামনেও ক্ষমতায় এলে প্রতিশোধ নেবে, আর তাদের পরিণাম এটাই হবে।
অর্থাৎ, আমরা এমন এক আনস্টেবল দুর্ভাগ্যের বীজ বপন করছি, যেখানে হাজার হাজার দুর্ভাগ্য বীজ থেকে জন্ম নেওয়ার অপেক্ষায় আছে।
তাহলে উপায় কী মুক্তির জন্য?
আমার মত, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো, গোলাম পরওয়ারের মতো, রাশেদ খাঁনের মতো যত মুখ আছে, সবার মুখে লাগাম দিতে হবে। আর একটি প্রকৃত রিকন্সিলিয়েশনের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। হত্যার অভিযোগ কখনো তামাদি হয় না, যার যার বিচার করবেন, যতটা প্রমাণ করতে পারেন বিচার করেন, যাদেরটা প্রমাণ করতে পারেন না, তাদের ভুতুরে মামলায় হয়রানি করবেন না৷
খারাপ লাগছে আমার কথা?
দিনভর কী করেছেন সবাই হুঁশ আছে?
গতকাল রাতে কী করেছেন হুঁশ আছে?
আয়াসের সাথে কী হয়েছে হুঁশ আছে?
আয়াস কী করেছিল হুঁশ আছে?
সালাউদ্দিন আম্মার কী করেছে, হুঁশ আছে?
হ্যাঁ, এই জুলাইয়েই এসব করেছেন আপনারা।
লেখা
মোঃ তারেক রহমান
সাধারণ সম্পাদক, আমজনতার দল