বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি পুরনো কিন্তু বিতর্কিত শব্দবন্ধ বা পরিভাষা—কিচেন কেবিনেট। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, সরকার পরিচালনার আড়ালে একটি অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলয় সক্রিয় ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় ওই গোষ্ঠীর বৈঠক হতো এবং সেখান থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। বক্তব্যটি সামনে আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র আলোচনা। কারণ এটি শুধু একটি অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা গোষ্ঠীর কথকতা নয়; বরং রাষ্ট্রক্ষমতার আড়ালের বাস্তবতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নিয়েছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নিয়েছে। এখন বেরিয়ে আসছে অন্তবর্তী সরকারের নানা ব্যর্থতার খতিয়ান। মুখ খুলতে শুরু করেছেন সাবেক সরকারের উপদেষ্টারা। কেউ কেউ বলছেন, সেই সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতো কেবিনেটের বাইরে। অর্থাৎ সরকারের ভেতরে আরেকটি সরকার। যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কিচেন কেবিনেট। প্রশ্ন উঠেছে কারা ছিলেন সেই কেবিনেটের সদস্য, যারা অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং যাদের কথায় সরকার চলতো।
এ নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন সাবেক অন্তবর্তী সরকারের শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে তিনি প্রথম বোমাটি ফাটান। তার মতে, তিনি এই কেবিনেটের বিষয়ে বিস্তারিত জানতেন না। তবে সেখানেই যে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো হতো তিনি নিশ্চিত করেছেন। আর মূল কেবিনেটে নেওয়া হতো সাধারণ সিদ্ধান্ত।
গত ২৫ মে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে একই সুরে কথা বলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, এই কেবিনেট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিসহ নীতিনির্ধারণী সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটি তিনি জানতেন না। এর এক দিন পর এ বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন আরেক সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে তিনিও এতে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। তাহলে আলোচিত এই কিচেন কেবিনেটে ছিলেন কারা? এখন সবার আলোচনায় এই কিচেন ক্যাবিনেট।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে, যখন তৎকালীন উপদেষ্টা ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও এমন একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে কখনোই ওই বলয়ের সদস্য ছিলেন না। মজার বিষয় হলো, যাদের নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে, তাদের কেউই সরাসরি দায় নিতে রাজি নন। যেন সবাই জানেন, এমন কিছু ছিল, কিন্তু কেউ তার ভেতরে ছিলেন না। রাজনৈতিক মহলের অনেকে বলছেন, এখানেই আসল রহস্য।
কিচেন কেবিনেট শব্দটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর রাজনৈতিক অর্থ অনেক গভীর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি এমন একটি অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বলয়, যারা সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে থেকেও সরকারপ্রধানের সবচেয়ে আস্থাভাজন হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করেন। তারা মন্ত্রী নাও হতে পারেন, জনগণের ভোটেও নির্বাচিত নন, কিন্তু ক্ষমতার করিডোরে তাদের কথাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা শুধু অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করে, আর প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আড়ালে।
এই শব্দটির ইতিহাসও বেশ নাটকীয়। উনিশ শতকের আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সময় প্রথম কিচেন কেবিনেট শব্দটি চালু হয়। জ্যাকসন আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার চেয়ে ব্যক্তিগত বন্ধু ও ঘনিষ্ঠদের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। সমালোচকেরা ব্যঙ্গ করে বলতেন, এসব লোকজন হোয়াইট হাউসের সামনের দরজা দিয়ে নয়, রান্নাঘরের পেছনের পথ দিয়ে ঢোকেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় কিচেন কেবিনেট বা রান্নাঘরের মন্ত্রিসভা শব্দটি। সময়ের সঙ্গে এটি বিশ্ব রাজনীতির বহুল ব্যবহৃত এক পরিভাষায় পরিণত হয়।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় সব বড় রাষ্ট্রেই কোনো না কোনো সময়ে এমন ছায়া উপদেষ্টা বলয় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ঘনিষ্ঠ যুদ্ধ উপদেষ্টা দল নিয়ে বিতর্ক ছিল। আমেরিকায় রিচার্ড নিকসনের প্যালেস গার্ড কিংবা রোনাল্ড রিগানের ব্যক্তিগত উপদেষ্টা চক্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সাম্প্রতিক সময়েও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রভাব নিয়েও বহু বিতর্ক তৈরি হয়। ভারতের রাজনীতিতেও প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরের একটি ছোট গোষ্ঠী নীতিনির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশেও কিচেন কেবিনেট নতুন কোনো ধারণা নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন সরকার আমলেই ক্ষমতার কেন্দ্রের আশপাশে এমন অনানুষ্ঠানিক বলয় ছিল। তবে এবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের মতো একটি সংবেদনশীল সময়ে যদি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ গণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহির মধ্যে থাকার কথা। আর অন্তবর্তী সরকারের মতো বিপ্লবী ধাচের সরকারে তো কথাই নেই। এ দেশের মানুষ বহু আশা নিয়ে ওই সরকারের দিকে তাকিয়েছিল।
সমালোচকেরা বলছেন, কিচেন কেবিনেট মূলত তখনই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। সংসদ, মন্ত্রিসভা কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো যদি কার্যকরভাবে ফাংশন না করে (কাজ না করে) তখন আড়ালের এই বলয়গুলোই প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি হলো, সরকারপ্রধানের কিছু বিশ্বস্ত উপদেষ্টা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ সব সিদ্ধান্ত কেবল আনুষ্ঠানিক বৈঠকে নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে সমস্যা তখনই, যখন সেই উপদেষ্টারা নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সাংবিধানিক কাঠামোর চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত নেন।
সাম্প্রতিক এই বিতর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও সরব। কেউ বলছেন, দেশের মানুষ অবশেষে বুঝতে পারছে ক্ষমতার দৃশ্যমান মুখ আর প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। আবার কেউ এটিকে ডিপ স্টেট ধরনের ছায়া রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করছেন। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিচেন কেবিনেট আর গভীর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। তবে দুটির মিল হচ্ছে—উভয় ক্ষেত্রেই আড়ালের শক্তি প্রকাশ্য কাঠামোর চেয়ে বেশি প্রভাব খাটাতে পারে।
দুই শতক আগে আমেরিকার এক প্রেসিডেন্টের রান্নাঘরের পেছনের দরজা দিয়ে যে রাজনৈতিক শব্দের জন্ম হয়েছিল, সেটিই এখন বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তপ্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আর এই বিতর্ক নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, জনগণ এখন শুধু সরকার দেখতে চায় না: তারা জানতে চায়, আসলে সিদ্ধান্ত নেয় কারা। তাহলে কি বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো ওই কিচেন থেকেই আসে? সহস্রাধিক তরুণ তাজা প্রাণের বিনিময়ে যে অন্তবর্তী সরকার ১৭ মাস দেশ পরিচালনা করল, তারা কেন পারল না সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে? তাহলে কি কিচেন ক্যাবিনেটই এর জন্য দায়ী। অনেকেই সেই ক্যাবিনেটে ছিলেন, কিন্তু এখন তারা স্বীকার করছেন না কেন? সামনে কি তাদের পরিচয় বেরিয়ে আসবে? জাতি তাদের পরিচয় জানতে মুখিয়ে আছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক