২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এক অভূতপূর্ব এবং জটিল মোড় নিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ধরনের ভারসাম্যমূলক কিন্তু কৌশলী পথে হাঁটার চেষ্টা করছেন।
তারেক রহমানের সরকারের জন্য একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মাঝে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের মধ্যপ্রাচ্য সফর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর এটাই প্রমাণ করে যে, সরকার সব পক্ষের সঙ্গেই সক্রিয় এবং সরাসরি যোগাযোগের পথ বেছে নিয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলের দীর্ঘ দেড় দশকের অতিমাত্রায় ভারত-ঘনিষ্ঠ এবং ভারতের একমুখী প্রভাবাধীন পররাষ্ট্রনীতির পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নজিরবিহীন আস্থার সংকট তৈরি হয়, যার ফলে সম্পর্ক প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় প্রদান, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের আন্তর্জাতিক লবিং ও কড়া প্রতিক্রিয়ার ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক দূরত্ব চরম আকার ধারণ করে।
এমন এক পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এখন এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে; যেখানে অতীতের দলভিত্তিক আনুগত্য ঝেড়ে ফেলে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা এবং একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও চীনের বিনিয়োগের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে না ঝুঁকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তার সাফল্য মূলত নির্ভর করবে ভারতের মতো প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আস্থার সংকট কাটিয়ে বাস্তববাদী ও সার্বভৌম কূটনীতি কতটুকু কার্যকর করা যায় তার ওপর।
বর্তমান সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এক নতুন উষ্ণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তজনায় বাংলাদেশের প্রাথমিক অবস্থান কিছুটা মার্কিন ঘেঁষা বলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদমাধ্যমে সমালোচিত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানালেও ইরানে মার্কিন হামলার বিষয়ে নীরব থাকা এবং পরবর্তীকালে ভারসাম্য রক্ষার খাতিরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করার ঘটনাগুলো একটি অদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে লেখা চিঠিতে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের উল্লেখ থাকায় এটি স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন ঢাকাকে তাদের নিরাপত্তা বলয়ে আরও নিবিড়ভাবে দেখতে চায়। তবে এটি সরাসরি চীনের উদ্বেগের কারণ হতে পারে, যার ফলে সরকারের জন্য চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তারেক রহমানের সরকারের জন্য আসল লিটমাস টেস্ট বা অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। এই প্রকল্পটি চীন নাকি ভারত বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে কয়েক বছর ধরে চলা দোটানা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বিশাল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই বলে দেবে বাংলাদেশ আসলে কৌশলগতভাবে কোন দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত একটি ত্রিমুখী কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে; যেখানে রপ্তানি খাতের কাঁচামালের জন্য চীন ও ভারতের ওপর নির্ভর করতে হয়, আর উৎপাদিত পণ্য বিক্রির প্রধান বাজার হলো ইউরোপ ও আমেরিকা। এই বাস্তবতায় কোনো এক পক্ষকে বাদ দিয়ে অন্য পক্ষকে গ্রহণ করার মতো বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ বর্তমান সরকারের নেই।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে যে, তাদের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক নয় বরং তা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা বা বাণিজ্য ঘাটতি এবং চীনের সঙ্গে বিনিয়োগের বিষয়গুলো দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। এখানে কোনো বড় দেশ নাখোশ হবে কি না, তার চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত থেকে ডিজেল আমদানি নিশ্চিত করে জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং একই সময়ে চীনের বিশাল বিনিয়োগ ধরে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক চাপ সামলানো হবে অত্যন্ত কঠিন। পররাষ্ট্রনীতিকে যাতে দলীয় তকমা না দেওয়া হয়, সে জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করাও সরকারের জন্য একটি বড় দায়বদ্ধতা।
অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল লুক ইস্ট পলিসি বা পূর্বমুখী নীতি। তখন চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে পশ্চিমা ও ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি চেষ্টা ছিল। খালেদা জিয়ার আমলে পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্কের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু তারেক রহমানের বর্তমান নীতিতে অনেক বেশি বাস্তবতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে সরাসরি ঝুঁকে না গিয়ে বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে নিজেকে নিরপেক্ষ রেখে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাইছে।
তবে ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ঢাকাকে প্রতিনিয়ত চাপের মুখে রাখছে, যার ফলে এই ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা সফল হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে গভীর আলোচনা ও সংশয় রয়ে গেছে।
বর্তমানের এই উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সরকার এক ঐতিহাসিক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি, যেখানে ভারত-তোষণ বা একতরফা আনুগত্যের পুরোনো পথ মাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। একদিকে দিল্লির সাথে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের বাস্তবসম্মত বোঝাপড়া ছাড়া স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যেমন কঠিন, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি-র মতো শক্তিশালী ও সোচ্চার বিরোধী দলের উপস্থিতি সরকারকে প্রতিটি পদক্ষেপে জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য করছে।
অতীতের ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের সংস্কৃতি ভেঙে যাওয়ায় এবং বর্তমানে জনআকাঙ্ক্ষা তীব্র হওয়ায়, যেকোনো আপসকামী সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে, চীনের বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে এমন এক সার্বভৌম ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি সাজাতে হচ্ছে, যেখানে ভারতের সাথে সম্পর্ক হবে কেবল সমতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে—যা মূলত একটি সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিবার্য পথ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক।
ইমেইল: [email protected]