আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের বড় অংশই আর্থিকভাবে স্বল্প আয়ের। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া মোট দুই হাজার ২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮৩২ জনের বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকার কম, যা মোট প্রার্থীর ৪১ শতাংশের সামান্য বেশি।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তথ্য উপস্থাপন শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্প আয়ের এই প্রার্থীদের পাশাপাশি আরও ৭৪১ জন প্রার্থীর বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে, যা মোট প্রার্থীর ৩৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ মোট প্রার্থীদের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগের বার্ষিক আয় ২৫ লাখ টাকার নিচে।
ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা আয় করেন ১৩২ জন প্রার্থী। ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা আয় করেন ৭১ জন যা মোট প্রার্থীর সাড়ে তিন শতাংশন। আর এক কোটির বেশি আয় উল্লেখ করেছেন মাত্র ৯৫ জন প্রার্থী, যা মোটের সাড়ে চার শতাংশের সামান্য বেশি।
এ ছাড়া ১৫৫ জন প্রার্থী আয়সংক্রান্ত তথ্য অসম্পূর্ণ বা উল্লেখ করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, আয় গোপন বা অসম্পূর্ণ তথ্য রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বল্প আয়ের প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কিছু বড় ও মাঝারি রাজনৈতিক দলে। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও কম আয়ের অংশ উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে এক কোটির বেশি আয় করা প্রার্থীদের মধ্যে সর্বাধিক ৫১ জন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের, স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫ জন ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছেন পাঁচ জন। এই তথ্য রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার উচ্চ আয়ের প্রার্থীর হার কিছুটা কমেছে। তখন এক কোটির বেশি আয় করা প্রার্থীর হার ছিল আট দশমিক ৭৭ শতাংশ, এবারে তা নেমে এসেছে চার দশমিক ৫৯ শতাংশে। একইভাবে, পাঁচ লাখ টাকার কম আয় করা প্রার্থীর হারও কিছুটা কমেছে, তবে এখনও মোট প্রার্থীর প্রায় অর্ধেকই স্বল্প আয়ের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একদিকে রাজনীতিতে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিলেও, অন্যদিকে নির্বাচনী ব্যয় ও প্রকৃত আয়ের সঙ্গে হলফনামায় ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আয় কম হলেও অনেক প্রার্থীর ব্যয় ও সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থের অপ্রকাশ্য ভূমিকার দিকটি সামনে আনে। তারা বলছেন, হলফনামা সংস্কার ও কঠোর যাচাই ছাড়া প্রকৃত আর্থিক চিত্র পাওয়া কঠিন।
সুজনের তথ্যে শীর্ষ ১০ জন আয়কারীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। শীর্ষ তিন আয়কারী হলেন:
১. জাকারিয়া তাহের (কুমিল্লা–৮, বিএনপি) : বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা (তালিকার শীর্ষে)।
২. মো. আসাদুল ইসলাম (টাঙ্গাইল–১, স্বতন্ত্র) : বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
৩. জাকির হোসেন পাটওয়ারী (লক্ষ্মীপুর–১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) : বার্ষিক আয় প্রায় ১৯ কোটি টাকা।
তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছেন যথাক্রমে মির্জা আব্বাস (বিএনপি, নয় কোটির বেশি), সালাউদ্দিন আলমগীর (স্বতন্ত্র, আট কোটির বেশি), সালাহউদ্দিন আহমদ (বিএনপি), মো. জসীম উদ্দিন (বিএনপি), কায়সার কামাল (বিএনপি), শফিকুল ইসলাম রাহী (স্বতন্ত্র) ও রেদোয়ান আহমেদ (বিএনপি)। তাদের সবার আয় চার থেকে সাড়ে ছয় কোটি টাকার মধ্যে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ও কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। তাঁরা হলফনামার তথ্যের স্বচ্ছতা এবং প্রার্থীদের আয়ের উৎস নিয়ে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।