ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও গণভোট কড়া নাড়ছে দরোজায়। দেশে দুটি বড় জোট—বিএনপি এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রধান রাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে ভোটের মাঠে দৃশ্যমান। তবে এই জোটগুলোর বাইরে থেকে এককভাবে নির্বাচন করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ভোটের মাঠে জোটের ভেলায় না ভেসে এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতোমধ্যে তারা দৃষ্টি কেড়েছে।
বিগত শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ইসলামী আন্দোলন প্রায় সব পর্যায়ের নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিয়েছে। ফলে দলটির নেতাদের সরাসরি তৎকালীন সরকারের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। তবে দলটির অনেকের ভাষ্যমতে, তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র ধরে রেখে অতীতের ভোটগুলোতে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়ম সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
এবার সংসদ নির্বাচনে দলটি প্রথমে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে ছিল। কিন্তু আসন সমঝোতা ও আদর্শিক মতভিন্নতার কারণে জোট ত্যাগ করে। এরপর তারা ২৬৫টি আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব জানাচ্ছে, এই কৌশল কেবল আসন জয়ের চেষ্টা নয়। তাদের মূল লক্ষ্য হলো—সম্ভাব্য উচ্চকক্ষে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উপস্থিতি দৃঢ় করা।
এ বিষয়ে গত শুক্রবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা প্রায় ৩০টি আসনকে টার্গেট করে সাংগঠনিকভাবে কাজ করছি এবং সেসব এলাকায় ভালো ফলের ব্যাপারে আশাবাদী।’
তবে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাওলানা কাইয়ুম বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হচ্ছে না। বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং দলীয় মহিলা টিমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।’ তিনি কমিশনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন।
সংসদের উচ্চকক্ষ প্রসঙ্গে দলটির ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, “নিম্নকক্ষের কোনো প্রতিনিধি যদি দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে উচ্চকক্ষে থাকা প্রতিনিধিরা তাকে সতর্ক করতে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবেন। এটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।”
আবদুল কাইয়ুম আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে জনমতের ধারা অনুযায়ী, হাতপাখা প্রতীকের পক্ষে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ ভোট অর্জনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। ইসলামের মূল আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দলকে ভোটাররা সমর্থন দেবেন, এমনটাই বিশ্বাস দলের।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার ও অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই কমিশনে প্রায় ৩৯টি দলের অংশগ্রহণে দেশের সার্বিক সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়—গণভোটের মাধ্যমে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো, সেসব বিষয় সংস্কার প্রক্রিয়ায় আনার জন্য এই গণভোট আয়োজন করবে সরকার।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, গণভোটে অনুমোদিত হলে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ হবে ১০০ আসনবিশিষ্ট। সদস্যরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন না, বরং জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মোট ভোটের ভিত্তিতে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে আসন বণ্টন করা হবে। কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, উচ্চকক্ষে সে দলের আসনও প্রায় সমান অনুপাতে থাকবে। নির্বাচন কমিশন ভোটের হিসাব করে নির্ধারিত ফর্মুলা অনুযায়ী আসন ভাগ করে দেবে এবং প্রতিটি দল তাদের প্রাপ্য আসনের বিপরীতে সদস্য মনোনয়ন দেবে।
সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করবেন। উচ্চকক্ষের ক্ষমতা সীমিত হলেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা অর্থবিল উত্থাপন করতে পারবে না এবং কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না। তবে অন্যান্য সব বিল পর্যালোচনা ও সংশোধন করার সুযোগ থাকবে। এক মাসের বেশি সময় কোনো বিল উচ্চকক্ষে আটকে থাকলে সেটি অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। এই কাঠামোর মাধ্যমে উচ্চকক্ষকে আইন প্রণয়নের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পর্যালোচনামূলক ও ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরা হয়েছে। এতে ছোট দল, নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং সংখ্যালঘু মতাদর্শও সংসদীয় কাঠামোর ভেতরে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে।
প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ বলেন, ‘জোট ত্যাগের মূল কারণ ছিল উচ্চকক্ষে আসনের সংখ্যা নয়, বরং আদর্শিক ভিন্নতা। বিএনপি ও জামায়াত শরিয়াহ প্রশ্নে সরে গিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক রূপরেখা গ্রহণ করেছে। নির্বাচনী সমঝোতায় দলকে এমন আসন প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেখানে তারা সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত ছিল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম অপু বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়; বরং রাজনৈতিক অবস্থান যাচাইয়ের একটি কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। তারা মূলত সারাদেশে নিজেদের শক্তি ও সমর্থনের বাস্তব চিত্র বোঝার চেষ্টা করছেন, যা রাজনৈতিকভাবে অবস্থান পরিষ্কার করার একটি পদক্ষেপ।’
সহকারী অধ্যাপক আরিফ আরও বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট—এই দুই ধারার বাইরে গিয়ে এককভাবে রাজনীতি করা কতটা ফলদায়ক হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ইতোমধ্যে একটি বৃহত্তর জোট গড়ে উঠেছে, যেখানে মূলধারার ইসলামী দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুই প্রধান জোটের বাইরে অবস্থান নেওয়াকে রাজনৈতিকভাবে খুব একটা পরিপক্ক বলা যায় না।’
ঢাবির এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘তারা আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে ছিলেন এবং সেই জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সেখান থেকে সরে এসে এককভাবে চলার সিদ্ধান্ত তাদের জন্য কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। জোটে থাকলে ভোটাররা যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারতেন, এখন তারা দ্বিধায় পড়ছেন—কাকে সমর্থন করবেন। ফলে এটি তাদের নিজেদের ভোটারদের জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।’
সহকারী অধ্যাপক আরিফ আরো বলেন, ‘এ বছর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব আন্দোলন সফল হয়নি। যদি এটি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আন্দোলনে ইসলামী আন্দোলন শুরু থেকেই সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যেহেতু এই বড় পরিবর্তনটি সম্ভব হয়নি, তাই এ বছর এককভাবে চলার নীতিতে ভালো ফল আসবে বলে মনে হয় না। জোটে থাকলে তারা সংসদে কিছু আসন পেতে পারত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারত, যা থেকে তারা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’
তবে আরেকটি দিকের কথাও উল্লেখ করেন এই শিক্ষক। তার মতে, ‘ইসলামী আন্দোলনের নেতারা হয়তো আশা করছেন উচ্চকক্ষে অন্তত কিছু প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ তৈরি হবে। যেহেতু আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ধারণার প্রতি তারা বরাবরই অনুগত, তাই নিম্নকক্ষে তা বাস্তবায়ন না হলেও উচ্চকক্ষে সে ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার বিষয়ে তারা আশাবাদী থাকতে পারেন।’
সহকারী অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে তাদের সমর্থন আগের তুলনায় বেড়েছে। জুলাই আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের একটি আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। সম্ভবত তারা এটি স্বতন্ত্রভাবেই ধরে রাখতে চাইছেন। জোটে থাকলে স্বতন্ত্র পরিচয় ও শক্তির জায়গা কিছুটা সংকুচিত হতে পারত।’
সহকারী অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে বড় কোনো নির্বাচনী সাফল্য না এলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বতন্ত্র ও বড় ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করাই হয়তো তাদের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতোমধ্যেই বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই গুরুত্ব হারানোয় নতুন করে জায়গা তৈরি হয়েছে। সেই জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন শক্তি অবস্থান নিচ্ছে। এই বাস্তবতায় ইসলামী আন্দোলন ভবিষ্যতে একটি বড় জাতীয় শক্তি হয়ে ওঠার লক্ষ্যেই সম্ভবত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
নির্বাচনী পরিসরে ইসলামী আন্দোলন প্রায়ই একক প্রার্থী দিয়ে বা ছোট জোটের মাধ্যমে অংশ নিয়ে ভোটে প্রভাব রাখার চেষ্টা করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল নির্বাচনী জয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উপস্থিতি ও সংখ্যানুপাতিক প্রভাব তৈরি করা। ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী সমাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তারা সরকারের নীতিকে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন এবং প্রস্তাবনা দিয়েছে। যদিও বিগত আওয়ামী সরকারের কারণে সরাসরি নীতি প্রণয়নে ইসলামী আন্দোলন প্রভাব ফেলতে পারেনি, তবু তারা সিদ্ধান্ত ও নীতি ঘিরে সমালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকে মনে করেন।