জুলাই হত্যা মামলার আসামি হয়েও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন উপ-পরিচালক পদে কর্মরত খালেদ ফয়সাল রহমান। একই সঙ্গে তাকে বিটিআরসির তথাকথিত ‘ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের’ অন্যতম প্রধান হোতা হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা মামলার আসামি খালেদ ফয়সাল রহমান। মামলাটিতে তার বাবা কুমিল্লা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে কুমিল্লা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান বাবলুও আসামি। এছাড়া তার বোন যুবলীগ নেত্রী মাশিহা ইসরাত ঐশিও মামলার আসামি। পুলিশ একাধিকবার ধানমণ্ডি থানার আওতাধীন তাদের বাসায় অভিযান চালালেও সেসময় তারা পলাতক ছিলেন। তবে এত গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও খালেদ ফয়সাল রহমানের বিরুদ্ধে বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি।
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত খালেদ ফয়সাল রহমান যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা মামলাটির ৯৩ নম্বর আসামি (মামলা নম্বর-১০৪, ২৬/০৩/২০২৫)। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০৭ জনকেও আসামি করা হয়েছে। সেইসঙ্গে ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় খালেদ ফয়সালকে পেনাল কোড-১৮৬০ এবং বিস্ফোরক পদার্থ আইন-১৯০৬-এর বেশকিছু ধারায় আসামি করা হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছে, পরস্পর যোগসাজশে উসকানিসহ ভাড়াকৃতভাবে আসিয়া বেআইনি জনতাবদ্ধে বিষ্ফোরক ফুটাইয়া দাঙ্গা সংগঠন করত: হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম করার অপরাধে আসামি করা হয়েছে।
এই মামলার বাদী মো. তারেক চৌকিদার। মূলত মামলাটি রাজনৈতিক মামলা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, এজাহারে বিটিআরসির উপ-পরিচালক খালেদ ফয়সাল রহমানের নাম কালেদ ফয়সাল রহমান (জিতু) উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বাবার নাম মফিজুর রহমান বাবলু এবং স্থায়ী ঠিকানা কুমিল্লার কোতোয়ালী ও বর্তমান ধানমণ্ডির ঠিকানা সূত্রে খালেদ ফয়সাল রহমানই উক্ত মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি।
নিয়োগ ও পদোন্নতিতে প্রভাব
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির একাধিক কর্মচারী ও কর্মকর্তা বলছেন, খালেদ ফয়সাল রহমান দীর্ঘদিন বিটিআরসির প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একচ্ছত্র প্রভাব খাটিয়ে আসছিলেন। তিনি নিয়োগ কমিটির সচিব হিসেবে কর্মচারী, ড্রাইভার, এমএলএসএস থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন। সরকার-দলীয় লোক ছাড়া অন্য কেউ যেন চাকরির সুযোগ না পায়, বিশেষ করে বিরোধী দল বা জামায়াত সংশ্লিষ্ট কেউ যেন নিয়োগ না পান—তা নিশ্চিত করাই ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব। ২০১৩ সালে সহকারী পরিচালক পদে ফজলুর রহমান শেখ সর্বোচ্চ নম্বর পেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করার অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও খালেদ ফয়সাল রহমানের ভূমিকা ছিল বলেও উল্লেখ করেন তারা।
চেয়ারম্যানের স্টাফ অফিসার থেকে ‘অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা’
বিটিআরসির বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, খালেদ ফয়সাল ছিলেন বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদারের স্টাফ অফিসার। ওই সময় খালেদের ক্ষমতা এতটাই বেড়ে যায় যে, তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসও কেউ করতেন না। তিনি তার বাবার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি শক্ত চক্র গড়ে তোলেন। এছাড়াও, বিটিআরসির নতুন ভবন প্রকল্পসহ বিভিন্ন কাজে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও সংস্থাটির ভেতরে ও টেলিযোগাযোগ খাতে কর্মরতদের মুখে মুখে প্রচলিত।
অবৈধ ২৯ নিয়োগ ও পদোন্নতি
বিটিআরসি সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জন ‘জুনিয়র পরামর্শক’কে সম্প্রতি পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এসব নিয়োগকে সরকারের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এই ২৯ জন এখনো বহাল তবিয়তে বিটিআরসিতে কর্মরত। তাদের অন্যতম একজন খালেদ ফয়সাল রহমান। সম্প্রতি তার পদোন্নতির ব্যাপারেও তদবিরের তোড়জোড় চলছে।
আরও জানা যায়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার বিটিআরসিকে চিঠি দিলেও কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে এসব কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য কমিশন-সভার তারিখ বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সারোয়ার হোসাইন নাগরিক প্রতিদিনকে জানান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কোম্পানি শাখা এসব বিষয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তি করে থাকে। সাধারণত ছোট-খাটো বিষয়গুলো উপদেষ্টা বা মন্ত্রী পর্যায়ে আসে না। এ বিষয়গুলো সচিব বা যুগ্ম সচিব পর্যায়ে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। যদি সচিব বা যুগ্ম সচিব পর্যায়ে বিষয়টি অবগত করা হয়, তাহলে উনারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য খালেদ ফয়সাল রহমানকে ফোন করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। এরপর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কল কেটে দেন। পরে বারবার তাকে ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি।
এসব বিষয়ে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারীকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।