বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সহযোগিতা জোরদার করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও শিল্প অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে সবার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং মান্দারিনসহ তৃতীয় ভাষা শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে চীনের গুয়াংডংয়ে ‘কারিগরি শিক্ষা সেতুবন্ধন ও চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক-বাণিজ্য মেধা উন্নয়ন’ শীর্ষক এক সিম্পোজিয়ামে তিনি এসব কথা বলেন। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প ও শিক্ষার সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এই সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের মূল অঙ্গীকার। সেই লক্ষ্যেই শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্লাসরুমের তাত্ত্বিক শিক্ষাকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সবার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখতে মান্দারিনসহ তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষক সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বসহ দ্বিপাক্ষিক শিক্ষা বিনিময় জোরদার করা উভয় দেশের সংযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের সহযোগিতা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আরও টেকসই ও পারস্পরিক সুবিধাজনক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বকে টেকসই করতে দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তোলা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সীমান্তপারের ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা, ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি ও আধুনিক লজিস্টিকসে পারদর্শী মানবসম্পদ তৈরি করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
চীনের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন যুগোপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করা হবে, যারা সরাসরি বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে জানান তিনি।
এ লক্ষ্যে উভয় দেশের শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধন সুদৃঢ় করার ওপর জোর দেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, নিয়মিত ফ্যাকাল্টি সহযোগিতা ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে চীনের আধুনিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে বৃত্তি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বহুগুণ বাড়ানোও সরকারের অন্যতম পরিকল্পনা বলে জানান তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, চীনের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদার আলোকে কারিগরি পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাস, আন্তর্জাতিক মানের কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন এবং যৌথ সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
পাশাপাশি চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারদের সঙ্গে বাংলাদেশের পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
চীনা শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে দুই দেশের মধ্যে আধুনিক কর্মসংস্থান বিনিময় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার পরপরই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চীনা শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইন্টার্নশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
চীনের ১১টি শীর্ষ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কলেজের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সিম্পোজিয়ামে মাহদী আমিন ছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন এবং চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রতিনিধি, শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী এবং শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করেন।
এই সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিষয়ে আধুনিক ল্যাব এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা স্থাপনেরও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা জানান মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল গৎবাঁধা পেশার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে হবে না; বরং যার যে ক্ষেত্রে আগ্রহ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে নিজেকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় উন্নীত করার সুযোগ পাবে।
এই রূপান্তরের পথে তরুণ প্রজন্ম যাতে আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় না পড়ে, সে জন্য যৌথ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং বাংলাদেশ-চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে চীনা শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথ বিনিয়োগের আহ্বান জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, চীনের কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি টেকসই রূপরেখা তৈরি করাই সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
এই রূপরেখার অধীনে সুনির্দিষ্ট অংশীদার চিহ্নিত করে দ্রুত যৌথ প্রকল্প, আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং একাডেমিক কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
মাহ্দী আমিন চীনের স্বনামধন্য শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। নতুন বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বমানের মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া।
এছাড়া চীনের বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রতিনিধি, শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী এবং শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চীনের অর্জনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিকীকরণে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বাংলাদেশের গভীর আগ্রহ রয়েছে।
বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করতে উচ্চমানের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে তিনি প্রযুক্তিগত শিক্ষা, আধুনিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ও চীনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার আহ্বান জানান।
শিক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, চীনা কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চলমান সহযোগিতা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখবে।
চীনের ১১টি শীর্ষ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কলেজের যৌথ উদ্যোগে সিম্পোজিয়ামটি অনুষ্ঠিত হয়। কলেজগুলোর মধ্যে রয়েছে- এনপিং ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন সেন্টার, গুয়াংডং লিটারেচার অ্যান্ড আর্ট ভোকেশনাল কলেজ, গুয়াংডং নানহুয়া ভোকেশনাল কলেজ অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কমার্স, গুয়াংডং পলিটেকনিক অব সায়েন্স অ্যান্ড ট্রেড, গুয়াংডং টিচার্স কলেজ অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড আর্টস, গুয়াংডং ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটেকনিক, গুয়াংডং কান্ট্রি গার্ডেন ভোকেশনাল কলেজ, গুয়াংডং জিয়াংমেন প্রিস্কুল এডুকেশন কলেজ, কিংইয়ুয়ান পলিটেকনিক, গুয়াংডং লিংনান ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজ এবং গুয়াংঝু প্রিস্কুল এডুকেশন কলেজ।
সিম্পোজিয়ামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বিশ্বব্যাপী কারিগরি শিক্ষার প্রসারে গুয়াংডং ‘চায়নিজ + ভোকেশনাল স্কিলস’ ইন্ডাস্ট্রি-এডুকেশন ইন্টিগ্রেশন অ্যালায়েন্স চালু করা। এটি কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
এ সময় বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ‘বেইডৌ+’ ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ল্যাবরেটরি ঘুরে দেখেন। তারা রোবোটিক্স, রোবট ডগের প্রোগ্রামিং এবং চীনা চা সংস্কৃতির প্রদর্শনীও পর্যবেক্ষণ করেন।
উভয় পক্ষ আলোচনাকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এর মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।