পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা ঘিরে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বেসরকারি দলের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
সংসদে আলোচনার একপর্যায়ে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ নিজ বক্তব্যে বাজেটের নানা দিক তুলে ধরে বলেন, এই বাজেট জনগণের স্বস্তির বাজেট। এবারের বাজেট ঘোষণার পর নিত্য-পণ্যের দাম বাড়েনি। সাধারণ মানুষ রাস্তায় মিছিল-মিটিং করেনি, যা দেশ স্বাধীনের পর একটি বিরল ঘটনা।
এ সময় প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার দিন বিরোধী দলের মিছিলের প্রসঙ্গ টেনে পবিত্র কোরআনের সুরা ইব্রাহিমের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বিরোধী দলকে শোকর (শুকরিয়া) আদায় করতে বলেন।
ওই আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘শোকর করতে হবে জীবনের, শোকর করতে হবে বরাদ্দের, শোকর করতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের, শোকর করতে হবে মন্ত্রীদের। তারা শোকর করে না, কিন্তু অস্বীকার করে। সেজন্য তাদের ওপর লাশাদীদুল আযাব, কঠিন আযাব তাদের সম্মুখীন করতে হবে।’
এরপর আবারও সুরা ইব্রাহিমের আরেকটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তোমরা বুঝেছ, তোমরাই কৌশলী, আপনারাই কৌশলী, কিন্তু আল্লাহ বলছেন, আমি শ্রেষ্ঠ কৌশলী। আর যারা আমার সঙ্গে কৌশল খাটায় তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।’
এ নিয়ে তার বক্তব্যের পর সংসদে হট্টগোল শুরু হয়। পরে ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ দাঁড়িয়ে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘কোরআনের আয়াত ও হাদিসে রাসুল (সা.) এর বাণী ঠাট্টা করার কোনো বিষয় না। এটি নিয়ে ঠাট্ট-বিদ্রূপ খুবই দুঃখজনক। এখানে কোরআনের আয়াত কোট করা হয়েছে। এটা ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) এর কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।’ এ সময় কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ার বিষয়টি এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান তিনি।
একপর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘কুরআন-হাদিসের যদি ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সেটি এক্সপাঞ্জড হবে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ, এই দেশে কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।’
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ একজন মাওলানা ও মাদরাসার ছাত্র। তিনি সম্পূর্ণ সৎ উদ্দেশ্যেই বলেছেন। এটিকে রাজনৈতিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা বা এটা নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলা মোটেও ঠিক হয়নি।’
এরপর আবারও হট্টগোল শুরু হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে এতেও হট্টগোল চলতে থাকলে একপর্যায়ে স্পিকারের কাছে কথা বলার অনুমতি চান রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। স্পিকার অনুমতি দিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। সেই সঙ্গে কোরআনের আয়াতটি নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গুণতে চাও তাহলে গুনে শেষ করতে পারবে না। মানুষের উচিত এই শক্তি দিয়ে আল্লাহর বিধিনিষেধের পক্ষে কথা বলা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আয়াতটির নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে এটিকে সম্পূর্ণ দলীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।’
পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্পিকার আবারও সব সংসদ সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে এতেও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে একপর্যায়ে নতুন করে যাতে বিতর্ক সৃষ্টি না হয় সেই শর্তে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামানকে কথা বলার সুযোগ দেন।
তিনি স্পিকারের কাছে এ বিষয়ে ওয়াদা করে বলেন, ‘পবিত্র কোরআনের আয়াতের মধ্যেই রয়েছে যে, আমরা শুনলাম এবং তা পালন করলাম। আলেম-ওলামাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে যেটি সঠিক, সেটির ওপর যেন সবাই আমল করে এবং এই আমলের মধ্য দিয়েই যেন সবার পরিশুদ্ধতা আসে।’
একপর্যায়ে স্পিকারের কাছে কথা বলার অনুমতি চান চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি। স্পিকার অনুমতি দিলে বিতর্কের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘যখন সংসদের সিনিয়র লিডাররা কথা বলবেন, তখন অন্য সদস্যদের স্বাভাবিকভাবেই আসন গ্রহণ করা উচিত।’
চিফ হুইপ আরও বলেন, ‘আমরা সবাই যেহেতু আল্লাহ ও রাসুলের (সা.) প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী ও অভিযুক্ত সদস্য মাহফুজ উল্লাহ নিজে একজন আলেম, তাই তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক বা পরিহাসের উদ্দেশ্যে এই কথা বলেননি। বরং সবার আমলকে আরও সহিহ ও শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত হৃদয় খুলে তিনি কথাটি বলেছেন।’
এ সময় সব সংসদ সদস্যদের এ বিষয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করার আহ্বান জানান চিফ হুইপ।