স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার উপপরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী দেশের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোর বাথরুম ও টয়লেট পরিষ্কারের দায়িত্ব সাংবাদিকদের দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য তিনি স্ট্যাটাসটি মুছে ফেলেন।
বুধবার (২৪ জুন) দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে ডা. শাফী লেখেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা করে তথ্য মন্ত্রণালয় ও তাদের অধীন সাংবাদিকদের বাংলাদেশের ৬০০ জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের বাথরুম, টয়লেট ও হাসপাতাল ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব অন্তত এক অর্থবছরের জন্য দেওয়া যেতে পারে। তার ভাষ্য, তারা এ কাজে সফল হলে স্থায়ীভাবেও দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
স্ট্যাটাসে তিনি আরও লেখেন, ‘রাষ্ট্রের কাজ, রাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণের কাজ যে ভালো পারবে, তাকেই দেওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডা. শাফী বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ একা সব সমস্যার জন্য দায়ী নয়। হাসপাতালের বাথরুম ও টয়লেটের অবস্থা কেন এমন হচ্ছে, সে বিষয়ে সামগ্রিক বাস্তবতা যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা পারছি না, এ ধরনের একটি আলোচনার জায়গা হতে পারে কি না, সেটাই বলেছি। বাথরুমগুলো কেন এমন অবস্থায় আছে, কোথাও থেকে কেউ তা তুলে ধরছে না। দায়টা শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের না হলেও সেটাই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দায় সাংবাদিকদের কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতালের ভবন সম্প্রসারণসহ নানা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়ও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমে কেবল চিকিৎসক ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের দায়ী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
দিকে সরকারি দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এ ধরনের মন্তব্য শিষ্টাচার ও আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন মন্তব্য করতে পারেন না তিনি। আমি দেশের বাইরে তবুও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানাব। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য মন্তব্যের সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিলে সেটি ডিলিট করে তার বক্তব্যের পক্ষে ব্যাখ্যামূলক আরেকটি স্ট্যাটাস দেন ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী। সেখানে তিনি বলেন, ‘পোষ্ট পেয়ে আমার কাছের মানুষ, আমার চেনাজন সাংবাদিক ভাইয়েরা কষ্ট পেয়ে আমাকে ফোন দিয়েছেন, যে কেন আমি এমন একটি পোষ্ট দিলাম এবং এটি দিয়ে তাদেরকে অসম্মানিত করলাম কিনা বা আমি আমার অবস্হান থেকে এমনটা লিখতে পারি কিনা। উনাদের কষ্ট জেনে আমি পোষ্টটি সরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু, কেন এটি দিয়েছিলাম, সেটি তো সবাইকে জানতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রথমত, দীর্ঘদিন যাবৎ অনলাইন, অফলাইন, সর্বত্র হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ড, বারান্দা, বাথরুম,টয়লেট ইত্যাদির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এমন ভাবে নিউজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত যে, এটা এখন একরকম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে হাসপাতালের দায়িত্ব প্রাপ্তরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে ব্যার্থ। দ্বিতীয়ত, যেহেতু এই ব্যার্থতার বিষয়টি সাংবাদিক ভাইয়েরাই প্রমান করেন, সেক্ষেত্রে তাদেরকে দায়িত্বটা দেয়া হলে কোন কার্যকর কিছু হতে পারে, এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক।’
সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বলেন, ‘কারণ, এই যে দিনের পর দিন এই বিষয়গুলো নিয়ে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে নিউজ হচ্ছে এবং ডাক্তররা জাতির চোখে শত্রুতে পরিণত হচ্ছে, কিন্তু, এর টোটাল কাহিনীটা সাংবাদিক ভাইয়েরা কেউ তুলে ধরেন না। অথচ, একটি সঠিক খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদের পুরোদিকটি তুলে ধরার নৈতিক দায় থাকা উচিৎ।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই উপপরিচালক বলেন, ‘বেশীরভাগ হাসপাতালগুলোর পুরান বিল্ডিং গুলো জরাজীর্ণ। ২৫০ বেডের হাসপাতালে রোগী থাকে ৫০০/৬০০। কোথাও আরও বেশী। রোগীর এটেন্ডেন্ট থাকে ইচ্ছে মতন। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষমতার অনেক উর্দ্ধে থাকে অপরিচ্ছন্নতার মাত্রা। পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সংখ্যাও অপ্রতুল। যারা আছে, তাদেরও অনেকে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পান এবং তারা অনেকে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন না।’
তিনি বলেন, ‘এর চাইতেও বড় বিষয় হলো, স্হাপনাগুলোর অভিভাবক হলো পিডব্লিউডি অথবা এইচইডি। তারা হাসপাতালের স্হাপনাগুলোর তাৎক্ষিনক ছোটখাটো মেরামত বা সংস্কার শত অনুরোধেও করেন না বা করতে চান না বা চাইলেও করতে পারেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এদিকে, রোগী ও তার এটেন্ডেন্টরা তাদের যাবতীয় বর্জ্য নিয়ে ফেলে কমোডে আর ওয়াশ বেশিনে। প্রতিনিয়ত এই বেশিন এবং কমোডের চ্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে যায় বর্জ্য দিয়ে। এগুলো প্রতিমুহূর্তে পরিষ্কার করা খুবই কঠিন বিষয় এবং চ্যানেলের ভিতরের দিকে ব্লক হলে সেটি পরিস্কার করা খুবই জটিল প্রক্রিয়া।’
সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বলেন, ‘ফলে, আপ্রাণ চেষ্টা করেও হাসপাতালকে কর্মকর্তাগণ পরিচ্ছন্ন রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু, মিডিয়ার সামনে কেউ এই পুরো বিষয়টি তুলে ধরছে না। সাংবাদিক ভাইরা শুধু নোংরার চিত্র তুলে ধরে চিকিৎসকদেরকে হেনস্তা করছেন। কিন্তু, মূল দায়ী যারা তারা সবসময়ই দায়িত্ব এবং দোষ, দুটোর বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘তাই, আমি লিখছিলাম যে, তথ্যবিভাগই হয়তো পারবে এই দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে। তাদের মনোকষ্ট লেগেছে, আঘাত পেয়েছেন তারা। আমি সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে আমি কাউকে এভাবে কস্ট দিতে পারিনা, এটাই ঠিক কথা। আমি দিতে চাইওনি কখনো। কিন্তু, কেউ তো আমাদের কথা ভাবছেনা। দিনের পর দিন শুধু দোষারোপ করা কোন কাজের কথা নয়। সমস্যার তো সমাধানের দিক নিয়েও সবাইকে ভাবতে হবে।’
সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বলেন, ‘দায়িত্বশীল পদের কথা যদি বলেন, সেক্ষেত্রে এটাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, সাংবাদিকতা যে কোন কাজের চাইতে অনেক বেশী দায়িত্বশীল কাজ। একটি সংবাদের সঠিকত্বের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। একটি ভুল সংবাদ, একটি সমাজকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। আবার একটি সঠিক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের মাধ্যমে সমাজে বড় কোন পজিটিভ পরিবর্তনও আসতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার এই উপপরিচালক বলেন, ‘তাই, আমার চাওয়া ছিল, সাংবাদিক ভাইয়েরা হাসপাতাল সংক্রান্ত বিষয়ে নিউজগুলোকে একপেশে দোষারোপ করা বন্ধ করে সঠিক কারণগুলো তুলে ধরুক। তাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গুলো নড়ে চড়ে বসবে এবং সমস্যার সমাধানও সম্ভব হবে বাস্তবে।’