চেরনোবিল শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারমাণবিক ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অঙ্গরাজ্য, বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্র ইউক্রেনের উত্তর অংশে অবস্থিত একটি শহর চেরনোবিল। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল সেই ভয়াবহ রাতে ভয়াবহ এক পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেখানকার একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির রিয়্যাক্টর ৪-এর বিস্ফোরণ বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। দুর্ঘটনার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশের প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘এক্সক্লুশন জোন’ বা নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রিপিয়াত নামের যে শহরটিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মীরা থাকতেন, সেটি এখন একটি পরিত্যক্ত ‘ভূতুরে শহর’ হিসেবে পরিচিত।
অনেকেই যখন বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশালাকার স্থাপনা দেখেন, তখন অবচেতনে তাদের মনে চেরনোবিলের সেই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্রটি ভেসে ওঠে। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে চেরনোবিল ও রূপপুর সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর দুটি প্রযুক্তি।
চেরনোবিলের মূলে ছিল ইউরেনিয়াম-২৩৫ জ্বালানি, যা পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করে। সেই শক্তিতে যখন তাপমাত্রা বাড়ে, তখন তাকে শীতল করতে ব্যবহার করা হয় পানি। চেরনোবিলের রিয়্যাক্টরটি ছিল আরবিএমকে ডিজাইনের, যেখানে নিউট্রন নিয়ন্ত্রক বা মডারেটর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল গ্রাফাইট। সেই রাতে একটি নির্দিষ্ট টেস্ট করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়াররা যখন রিয়্যাক্টরের পাওয়ার কমিয়ে আনেন, তখন সেখানে জেনন নামের এক উপজাত গ্যাস জমে বিক্রিয়াকে শ্লথ করে দেয়।
কিন্তু নিয়মের তোয়াক্কা না করে দ্রুত পাওয়ার বাড়াতে গিয়ে তারা প্রায় সবগুলো বোরন বা কন্ট্রোল রড তুলে ফেলেন। বোরন ছিল বিক্রিয়া থামানোর ব্রেক, আর সেই ব্রেক সরিয়ে নেওয়ার ফলেই রিয়্যাক্টরটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ৩৩ হাজার মেগাওয়াট শক্তি উৎপাদন করতে শুরু করে, যা একটি পারমাণবিক বোমার সমান। চেরনোবিলের সেই বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ ছিল বোরন রডের মাথায় গ্রাফাইটের টিপ থাকা, যা রড ঢোকানোর শুরুতে বিক্রিয়া কমানোর বদলে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন চেরনোবিল হবে না, তার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক কারণ হলো এর আধুনিক ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। এটি একটি থার্ড জেনারেশন প্লাস রিয়্যাক্টর, যা মূলত ওয়াটার মডারেটেড ও ওয়াটার কুলড পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া। এর অর্থ হলো, রূপপুরে চেরনোবিলের মতো বিপজ্জনক গ্রাফাইটের কোনো অস্তিত্ব নেই।
চেরনোবিলে গ্রাফাইট আগুনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল, কিন্তু রূপপুরে মডারেটর হিসেবে আছে সাধারণ পানি। যদি কোনো কারণে রূপপুরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তবে রিয়্যাক্টরের পানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাষ্প হয়ে যাবে এবং পানির ঘনত্ব কমে যাওয়ার ফলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নেগেটিভ রিঅ্যাক্টিভিটি কো-অফিসিয়েন্ট’ বলা হয়। অর্থাৎ রূপপুরের ডিজাইনটি এমনভাবে করা হয়েছে যে এটি প্রাকৃতিকভাবেই বিস্ফোরণবিরোধী। এ ছাড়া চেরনোবিলে কোনো কনটেইনমেন্ট বিল্ডিং বা সুরক্ষা দেয়াল ছিল না, যার ফলে তেজস্ক্রিয়তা সরাসরি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে রূপপুরে রয়েছে ডাবল লেয়ারের রিইনফোর্সড কংক্রিট কনটেইনমেন্ট, যা এমনকি একটি বিশাল যাত্রীবাহী বিমান আছড়ে পড়লেও অক্ষত থাকবে। এর ভেতর থেকে তেজস্ক্রিয়তা বাইরে আসার কোনো পথ নেই। এ ছাড়া রূপপুরে রয়েছে কোর ক্যাচার, যা রিয়্যাক্টর গলে যাওয়ার মতো চরম মুহূর্তেও সেই গলিত জ্বালানিকে নিজের ভেতর আটকে ফেলবে এবং মাটির নিচে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেবে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি সফল করতে বিপুল পরিমাণ শ্রম ও জনবল বিনিয়োগ করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ সরাসরি কাজ করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের পাশাপাশি রাশিয়ার পাঁচ থেকে সাত হাজার বিশেষজ্ঞ রাতদিন শ্রম দিয়েছেন।
২০১৬ সালে মূল নির্মাণ কাজ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক কোটি কর্মঘণ্টা বা ‘ম্যান-আওয়ার’ ব্যয় করা হয়েছে এই প্রকল্পে। একেকটি ইউনিটের কাজ সম্পন্ন করতে সাত থেকে আট বছর সময় লেগেছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রকৌশলীরা প্রতিটি পাইপলাইন, প্রতিটি তার ও প্রতিটি যন্ত্রাংশ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করেছেন। এ ছাড়া হাজার হাজার টন লোহা আর কয়েক লাখ ঘনমিটার কংক্রিটের সংমিশ্রণে তৈরি এই স্থাপনাটি বাঙালির সক্ষমতার এক অনন্য স্মারক।
রূপপুর কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং এটি লাখো মানুষের ঘাম আর হাজার হাজার প্রকৌশলীর মেধার ফসল। রাশিয়ার রোসাটম এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই বিশাল জনশক্তি অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে এই স্বপ্ন পূরণ করেছে। তাই প্রযুক্তির সুরক্ষা আর মানুষের নিবেদিত শ্রমের মেলবন্ধনে তৈরি রূপপুর চেরনোবিলের মতো কোনো দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো কারিগরিভাবে অসম্ভব।