যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর রহস্যময় অন্তর্ধান এখন একটি করুণ এবং লোমহর্ষক মোড় নিয়েছে। তারা দুজনই ফ্লোরিডার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১০ দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত তা-ই সত্যি হলো। গত ১০ দিনের রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে মার্কিন পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, দুজনকেই অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
নিহতরা হলেন- জামিল আহমেদ লিমন (২৭) এবং তার সহপাঠী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৭)।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত ফেসবুকের মাধ্যমে এই হৃদয়বিদারক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মার্কিন পুলিশ ফোন করে তাদের দুঃসংবাদটি দিয়েছে। সন্দেহভাজন ঘাতক হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহ-র (২৬) বাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া রক্তের নমুনার সঙ্গে বৃষ্টির ডিএনএ-র মিল পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বৃষ্টির মরদেহের অন্তত কিছু অংশ ওই বাড়িতেই ছিল।
জাহিদ হাসান প্রান্তের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ বৃষ্টির মরদেহের একটি অংশ উদ্ধার করতে পারলেও শরীরের বাকি অংশগুলো উদ্ধার হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নয়। ঘাতক অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেহটি খণ্ডবিখণ্ড করে আলামত লোপাটের চেষ্টা করেছিল। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সাবেক এই শিক্ষার্থীর এমন করুণ পরিণতিতে তার পরিবার ও সহপাঠীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
একই ধরনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বৃষ্টির সহপাঠী জামিল আহমেদ লিমন। শুক্রবার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয় এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত ও খণ্ডবিখণ্ড দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। লিমনের বাড়িতেই গত ১৬ এপ্রিল বৃষ্টিকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে লিমনের রুমমেট ও মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহকে। হিশামের বাড়ি থেকেই বৃষ্টির রক্তের দাগ ও মরদেহের নমুনা পাওয়া যায়। মার্কিন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, হিশাম অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই মেধাবী দুই গবেষককে এভাবে জীবন দিতে হলো, সে বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বৃষ্টি এবং ভূগোল বিভাগের শিক্ষার্থী লিমনের মৃত্যুতে পুরো ক্যাম্পাস এখন থমথমে। বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে। দুই শিক্ষার্থীর পরিবার এখন তাদের সন্তানদের অবশিষ্ট দেহাংশগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি সহযোগিতার অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে এফবিআই ও স্থানীয় পুলিশের যৌথ অনুসন্ধানে মরদেহের বাকি অংশ খোঁজা হচ্ছে।
লিমন ও নাহিদাকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল গত ১৬ এপ্রিল। লিমন তার বাসা থেকে সকাল ৯টায় এবং নাহিদা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে সকাল ১০টায় নিখোঁজ হন। পুলিশ নিশ্চিত করে যে, তারা কেউই ইমিগ্রেশন পুলিশের হেফাজতে নেই। এরপরই এই অন্তর্ধান নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেছেন। লিমনের পরিবার বাংলাদেশ থেকে তার এই রহস্যময় নিখোঁজ হওয়াকে শুরু থেকেই ‘খুবই সন্দেহজনক’ বলে দাবি করে আসছিল।
বর্তমানে দুই শিক্ষার্থীর ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে পুলিশ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ফক্স১৩ টাম্পা বে, ডব্লিউএফএলএ নিউজ এবং হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস।