তামাক নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ থেকে ই-সিগারেট এবং বিক্রয়স্থলে (পয়েন্ট অব সেল) তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধের ধারা বাদ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের সিদ্ধান্ত তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অর্জিত অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে পারে এবং তরুণদের মধ্যে নিকোটিন আসক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, ই-সিগারেটসহ ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব পণ্য তরুণদের জন্য ‘গেটওয়ে’ হিসেবে কাজ করে—যেখান থেকে তারা পরবর্তীতে প্রচলিত তামাক ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে বিক্রয়স্থলে তামাকজাত পণ্যের দৃশ্যমান প্রদর্শন শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের আকৃষ্ট করে এবং ব্যবহারকে উৎসাহিত করে।
সংগঠনগুলো এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, অধ্যাদেশ থেকে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেওয়া হলে তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী বিপণন কৌশল আরও সহজ হবে। এতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘ধারা দুটি অবিলম্বে পুনরায় যুক্ত করার জন্য আমরা সরকার ও সংসদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। জনস্বাস্থ্য ও তরুণদের নিকোটিন আসক্তি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সংকীর্ণ মুনাফার স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।’
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এ খাত থেকে অর্জিত রাজস্বের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩৫.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন।
এ প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী আইন প্রয়োগ ছাড়া তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তারা মনে করছেন, অধ্যাদেশের দুর্বলতা দূর করে কঠোর বিধান পুনর্বহাল করা না হলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
উল্লেখ্য, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গত বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ই-সিগারেট বা ইএনডিএস আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে ২৩ ডিসেম্বর অনুমোদিত সংশোধিত অধ্যাদেশে তামাকজাত পণ্যের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয় এবং ইএনডিএসসহ নতুন ধরনের তামাকপণ্য নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।
অধ্যাদেশের ৬ (গ) ধারায় ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ই-লিকুইড ইত্যাদি) উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছিল। এছাড়া ৫ (ক) ধারায় বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্য ক্রেতার দৃষ্টির আড়ালে রাখার নির্দেশনা ছিল।
বিবৃতি প্রদানকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে- অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা), ঢাকা আহছানিয়া মিশন, ডরপ, নারী মৈত্রী, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, পিপিআরসি, তাবিনাজ এবং প্রজ্ঞা।
তামাকবিরোধী আন্দোলনকারীরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারকে দ্রুত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে বাদ দেওয়া ধারা দুটি পুনর্বহাল করতে হবে। অন্যথায়, তামাক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের অর্জন হুমকির মুখে পড়তে পারে।