গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সময়ে হওয়া গণভোটের সার্বিক মূল্যায়নে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর এ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলো।
ইসি সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরির আগে তার রূপরেখা প্রস্তুত করা হবে। এ রূপরেখা আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে জমা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর নির্ধারিত কাঠামোর ভিত্তিতে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হবে।
তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার দেড় মাসের বেশি সময় পার হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন কার্যক্রম শুরুর কথা জানায়নি ইসি। এ বিষয়ে জানতে নির্বাচন কমিশনার ও সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা সুস্পষ্টভাবে কোনো অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করতে পারেননি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ মূল্যায়ন প্রতিবেদন ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং একটি আরও গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দুই সাবেক উপদেষ্টার বক্তব্যকে ঘিরে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনের ফলাফলে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেছে, মাঠ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা-রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসক এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসির কাছে জানতে চাওয়া হলেও অভিযোগগুলোর পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ নেই বলে জানিয়েছে ইসি।
এই প্রতিবেদককে ইসি সচিবালয়, নির্বাচন পরিচালনা শাখা এবং এনআইডি শাখার অন্তত ৭ জন কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে কেউই এই পরিসংখ্যান দিতে পারেনি।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ঈদের সপ্তাহখানেক আগে জানান, জাতীয় সংসদ-সংশ্লিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন মূল্যায়ন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারাবন্দিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ, দলীয় প্রতীক ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা এবং পরিবেশবান্ধব নির্বাচন নিশ্চিতে পোস্টারবিহীন প্রচারণা উল্লেখযোগ্য।
তিনি বলেন, ‘নতুন এসব বিধিমালা কতটা কার্যকর হয়েছে, নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে—তা নির্ধারণে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন জরুরি। বিভিন্ন বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে এখনো কাজ শুরু করা না গেলেও খুব শিগগিরই তা শুরু হবে।’
এদিকে নির্বাচন পরিচালনা শাখা থেকে নিশ্চিত করেছে, ইতোমধ্যে নির্বাচন মূল্যায়ন প্রতিবেদনের রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে, যার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এই রূপরেখা।
ইসি সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা দেবে।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে চারটি আসনে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এ ধরনের নিয়োগ বাড়ানো হবে কি না। ইতোমধ্যে বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে ও শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচনে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা আগামী ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক উপ-সচিব মনির হোসেন বলেন, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তারা বড় দায়িত্ব পালনে সক্ষম—এ নির্বাচনের মাধ্যমে তার প্রমাণ মিলেছে। তবে এ সক্ষমতার কার্যকারিতা নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ ও পদ্ধতিগত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় স্থগিত রয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়ে ১২৮টি কেন্দ্রে ভোট হয়নি; এ আসনে পুনঃভোট ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে বগুড়া-৬ আসনেরও নির্বাচন হবে।
ইসির তথ্য মতে, নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ২৮ জন—এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৩ জন, যার মধ্যে দলীয় ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র ২০ জন।
দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০, পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ১ হাজার ২৩২ জন। শেরপুর-৩ আসনের ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৩৭ জন ভোটার ভোট দিতে পারেননি। ফলে মোট ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৬ জন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান।
ফলাফলে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন এবং এনসিপি ৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বাকি আসনগুলোতে বিজয়ী হয়েছে।