বিশ্ব এখন এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে যে, এটি এখন আর কোনো হলিউড মুভির রূপালি পর্দার চিত্রনাট্য নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। বিজ্ঞান এবং যুক্তির প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবীকে একটি ভয়াবহ পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন ধীরে ধীরে। তিনি বিশ্বকে নিয়ে রীতিমত খেলছেন। যদিও গণিত দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের নিখুঁত সম্ভাবনা বের করা কঠিন, তবুও বলা যায় বর্তমান প্রেক্ষাপট এমন দাঁড়িয়েছে যে—ইরানের সাথে চলমান এই সংঘাত যেকোনো মুহূর্তে পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, মিস্টার ট্রাম্প স্বাভাবিক উপায়ে না পেরে ইরানকে বশে আনতে পরমাণু বোমার ব্যবহারও করে ফেলতে পারেন।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রাগারের চাবিকাঠি এমন একজন মানুষের হাতে, যার আচরণ চরম অস্থির এবং অনুমানের বাইরে! ট্রাম্পের এই দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্ব গ্রহণকে বিশেষজ্ঞরা নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন। তারা কয়েকটি বিশেষ ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন:
পরিবেশ পরিস্থিতি না বুঝে ভূরাজনীতি নিয়ে ভুল হিসাব-নিকাশ করা মাার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জটিল সামরিক পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে তিনি ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন বারবার।
আগামী ১৪ জুন, ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৮০ বছর বয়সে পদার্পণ করবেন। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। ট্রাম্পের এই বয়স এবং তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে। যে কারণে তিনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন।
কেবল ট্রাম্প নন, তার ইরানি প্রতিপক্ষও যদি জেদের বশবর্তী হয়ে ‘যৌক্তিক’ চিন্তার বাইরে চলে যান, তবেই ঘটবে বিপর্যয়। এবং সেটি প্রচলিত যুদ্ধের বাইরের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে একটি প্রথা চলে আসছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলে একক সিদ্ধান্তে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারেন। যদিও এটি মার্কিন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক, তবুও বর্তমানে এটিই বাস্তবতা। আজ যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পিট হেগসেথ এবং স্টিফেন মিলার—এই তিনজন মিলে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন, তবে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বহু দেশ মুছে যেতে পারে। একে কোনোভাবেই অতিরঞ্জিত ভয় বলা যায় না, বরং এটি মানব সভ্যতার এক করুণ উপহাস হয়ে থাকবে তখন।
ইরান যুদ্ধ ও পারমাণবিক সমীকরণ
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন আর কেবল প্রথাগত কামান-ক্ষেপনাস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। তেহরান যদি ইসরায়েলের পারমাণবিক চুল্লি (যেমন: ডিমোনা) লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়ে, তবে পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও পারে। এক্ষেত্রে দুটি পরিস্থিতি হতে পারে:
অপ্রতিসম যুদ্ধ: যেখানে কেবল এক পক্ষ (যুক্তরাষ্ট্র/ইসরায়েল) পারমাণবিক শক্তিধর। দ্বিতীয়ত, প্রতিসম যুদ্ধ: যেখানে ইরানসহ উভয় পক্ষই ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার অধিকারী। মনে রাখতে হবে, পারমাণবিক যুদ্ধে ‘কে বেশি শক্তিশালী’—তা বড় কথা নয়; কারণ তেজস্ক্রিয়তা বা ‘ডার্টি বোম্ব’-এর প্রভাবে কোনো পক্ষই তখন সুরক্ষিত থাকবে না।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমরা দেখছি এক অভাবনীয় বিদেশনীতি। ইউক্রেনকে রক্ষা করার বদলে ট্রাম্প আগ্রাসনকারী রাশিয়ার কাছেই নতি স্বীকারের প্রস্তাব দিচ্ছেন বারবার। এটি মূলত ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসী চিন্তাকে পুরস্কৃত করার সমান। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আগ্রাসী যুদ্ধকে সমর্থন দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। এর ফলে ন্যাটোর মতো দীর্ঘদিনের মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, যা বিশ্বকে আরও অস্থির করে তুলছে।
রণকৌশলের ভাষায় ‘অযৌক্তিক’ হওয়া মানেই ‘পাগল’ হওয়া নয়। কোনো দেশের নেতা যদি নিজের দেশের মানুষের জীবনের চেয়ে নিজের ধর্মীয় জেদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বড় করে দেখেন, তবে তাকে ‘অযৌক্তিক’ বলা হয়।
ট্রাম্প রহস্যময় এক চরিত্র। ট্রাম্প অনেক সময় ইচ্ছা করেই ‘পাগল’ সেজে থাকেন যাতে প্রতিপক্ষ ভয় পায়। কিন্তু এই ‘পাগল সাজা’ যদি সত্যি সত্যিই পাগলামিতে রূপ নেয়, তবে তা বুমেরাং হতে পারে তার জন্য, পৃথিবীর জন্যও।
যুক্তরাষ্ট্র এখন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপক্ষের জন্য আলাদা আলাদা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখা উচিত। সেইভাবে তাদের লড়াই করা উচিৎ। শত্রু-মিত্র না চিনে সবাইকে হামলার লক্ষ্যবস্তু না করা উচিৎ।
যুদ্ধের ময়দানে কার পরমাণু বোমার বাটন বড়—তা নিয়ে দম্ভ করা কোনো কাজের কথা নয়। পারমাণবিক নিরোধক ব্যবস্থা মানে কেবল ভয় দেখানো নয়, বরং এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া। প্রাচীন গ্রিক নাটকে দেখা যেত, বীরদের পতনের মূলে থাকতো তাদের ‘অহংকার’। ট্রাম্প যদি হোয়াইট হাউসে বসে কেবল প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কাজ করেন, তবে তিনি শান্তি নয়, বরং বিশৃঙ্খলাই ডেকে আনবেন।
জাতীয় নিরাপত্তা আসলে কোনো গায়ের জোরের বিষয় নয়, এটি হলো ‘মস্তিষ্কের বিরুদ্ধে মস্তিষ্কের লড়াই’। আজকের এই দিনে বিজ্ঞান, যুক্তি এবং মানবতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানেই হলো সমগ্র মানবজাতিকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া। ট্রাম্প বারবারই বৈজ্ঞানিক যুক্তি এবং মানবতাকে পাশ কাটিয়েই যাচ্ছেন।
লেখক: লুৎফর রহমান হিমেল | জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]