তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কখন যে কার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়, তা বলা মুশকিল। দক্ষিণ ভারতের এক অতি সাধারণ কিশোর অরুণ এখন তার জীবন্ত উদাহরণ। ট্রাকের চাকা পরিষ্কার করা যে হাতগুলোতে ছিল ঘাম আর কালি, সেই হাতগুলোই এখন কলম ধরছে আগামীর স্বপ্ন বুনতে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে ট্রাকের হেলপারি শুরু করা সেই কিশোরের এক চিলতে হাসি আজ তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
তামিলনাড়ুর এই কিশোরের দিন শুরু হতো ট্রাকের গ্রিজ আর ডিজেলের গন্ধে। অভাবের তাড়নায় পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ট্রাকের হেলপারি করতে হতো তাকে। ট্রাকের ড্রাইভার মেহেরুন আন্না তাকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। একদিন ট্রাক ধুয়ে-মুছে সাফ করার পর ক্লান্ত অরুণের হাতে এক কাপ চা ধরিয়ে দেন মেহেরুন। শরীর জুড়াতে অরুণের সাথে মেতে ওঠেন খুনসুটিতে।
ড্রাইভার আন্না অরুণকে একটি জোকস শোনান। সেই জোকস শুনে কিশোর অরুণ এমনভাবে হাসতে শুরু করে যে তার হাসি আর থামছিল না। সেই প্রাণখোলা হাসির মুহূর্তটি নিজের ফোনে ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করেন মেহেরুন আন্না। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওটি আপলোড হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের টাইমলাইন থেকে টাইমলাইনে ঘুরতে থাকে সেই স্নিগ্ধ ও অপাপবিদ্ধ হাসি।
অরুণের এই হাসির নেপথ্যে থাকা দারিদ্র্যের গল্প যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন বিষয়টি নজরে আসে রাজ্য সরকারেরও। বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল ও সংবাদমাধ্যমগুলোও এই মানবিক গল্পটি তুলে ধরে। অরুণের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং মেধাকে মূল্যায়ন করতে এগিয়ে আসে প্রশাসন। ট্রাকের হেলপারি ছেড়ে অরুণের জন্য উন্মুক্ত হয় স্কুলের দরজা।
অরুণ এখন আর ট্রাকের পেছনে ঝুলে থাকে না; বরং কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। আগামী বছর তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দারিদ্র্যের জয়গান গেয়ে সে এখন স্বপ্ন দেখছে একজন গ্র্যাজুয়েট হওয়ার।
অরুণ ভুলে যায়নি তার সেই দুঃসময়ের সঙ্গী ড্রাইভার মেহেরুন আন্নাকে। ভারতীয় মিডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অরুণ জানায়, আজ তার এই নতুন জীবনের কারিগর সেই বড় ভাই। সে চায় তার কর্মজীবনেও যেন মেহেরুন আন্না তার পাশেই থাকেন। অরুণের এই কৃতজ্ঞতাবোধ বিশ্বজুড়ে নেটিজেনদের মন জয় করে নিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে যখন হতাশা আর নেতিবাচক খবরের ছড়াছড়ি, তখন অরুণের এই হাসি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষেও এক চিলতে আলোর দেখা পাওয়া সম্ভব। অরুণ এখন আর কেবল একজন ট্রাক হেলপার নয়, সে এখন এক সম্ভাবনার নাম, যার হাসি কোটি মানুষকে হাসতে শিখিয়েছে।