বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর এবারের আসরটি (২০২৬) বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রমী ও ভিন্ন আমেজে পার হচ্ছে। প্রথাগত জমকালো হলিউড ব্লকবাস্টার সিনেমার চেনা দাপট এবার কান সৈকতে কিছুটা ম্লান। তবে সেই শূন্যতা পূরণে উৎসবের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সিনেমার শক্তিশালী গল্প, এশিয়ান নির্মাতাদের জয়জয়কার এবং চলচ্চিত্র শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব নিয়ে টেবিল কাঁপানো সব নতুন আলোচনা। চলচ্চিত্র সমালোচক ও বিশ্লেষকদের মতে, কান এবার সস্তা বাণিজ্যিক প্রচারণার চেয়ে সিনেমার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
ফ্রান্সের কান শহরে ১২ থেকে ২৩ মে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্র সাময়িকীর সূত্র অনুযায়ী, এবারের কানের প্রধান ভিন্নতাটি স্পষ্ট হয়েছে এর সিনেমা নির্বাচনের ক্ষেত্রে। বিগত কয়েক বছরে যেখানে 'টপ গান: ম্যাভেরিক', 'ইন্ডিয়ানা জোন্স' কিংবা 'ফিউরিওসা'-র মতো বিশাল বাজেটের হলিউড প্রজেক্টগুলো কানের রেড কার্পেট এবং গণমাধ্যমের স্পটলাইট দখল করে রাখতো, এবার সেখানে হলিউডি স্টুডিওগুলোর উপস্থিতি বেশ নিয়ন্ত্রিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরগুলোর লেখক ও অভিনয়শিল্পীদের ধর্মঘটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং বড় স্টুডিওগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলের পরিবর্তনের কারণেই এবার বড় পর্দার ব্লকবাস্টার সিনেমা কানে কম এসেছে বলে মনে করছেন হলিউড ইনসাইডাররা।
তবে হলিউডের এই অনুপস্থিতি কান উৎসবের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এবারের উৎসবের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে এশিয়ার স্বাধীন ঘরানার চলচ্চিত্র ও নির্মাতারা। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান পরিচালকদের সিনেমাগুলো এবার মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ থেকে শুরু করে 'আন সার্টেইন রিগার্ড' বিভাগে দারুণ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। বিশেষ করে পারিবারিক মনস্তত্ত্ব, ভূ-রাজনীতি এবং অভিবাসন সংকটের মতো গভীর বিষয়গুলো এশীয় নির্মাতারা যেভাবে সেলুলয়েডে তুলে এনেছেন, তা কান-এর জুরি বোর্ড এবং বিশ্বজুড়ে আসা সমালোচকদের গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে।
চলচ্চিত্রের গল্পের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি এবারের কানের সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (এআই)। কানের সমান্তরাল বিভিন্ন প্যানেল আলোচনা এবং 'কান মার্কেট'-এ এবার এআই নিয়ে বিতর্ক ও সম্ভাবনা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। চিত্রনাট্য লিখন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস থেকে শুরু করে সিনেমার পোস্ট-প্রোডাকশনে এআই-এর ব্যবহার কীভাবে সিনেমা নির্মাণের খরচ কমিয়ে আনছে, তা নিয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে; তেমনি এর আইনি ও নৈতিক ঝুঁকি নিয়ে সরব হয়েছেন সিনেমা জগতের শীর্ষ ব্যক্তিরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কান ২০২৬ চলচ্চিত্র দুনিয়াকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, প্রযুক্তির এই জোয়ারকে অস্বীকার না করে কীভাবে একে সৃজনশীলতার সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এখন সেই পথ খোঁজার সময় এসেছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব কেবল তারকাদের ঝলকানি আর গ্ল্যামারের চেনা বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই। বড় বাজেটের সিনেমার জৌলুস কিছুটা কম হলেও, বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রকৃত বৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিবান্ধব সিনেমা শিল্পের ভিত গড়ে দেওয়ার মাধ্যমে এবারের কান উৎসব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।