দেশের ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড খেলাপি ঋণ কমাতে এবং ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি এককালীন বিশেষ এক্সিট সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক সংকটে পড়ে ঋণ খেলাপি হলেও যেসব গ্রাহকের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এবং ঋণ পরিশোধে আন্তরিকতা আছে, তারা নির্দিষ্ট শর্তে এ সুবিধা নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৯ জুন এসংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছে। সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করতে ‘মন্দ’ ও ‘ক্ষতিজনক’ শ্রেণিভুক্ত ঋণের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩০ জুন ভিত্তি তারিখে শ্রেণিকৃত ‘মন্দ’ ও ‘ক্ষতিজনক’ ঋণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশেষ এক্সিট সুবিধার আওতায় নিষ্পত্তি করা যাবে। তবে এ সুবিধা পেতে ঋণগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ বকেয়া এককালীন পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে এ সুবিধার আওতায় আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ২০২২ সালের ২১ এপ্রিল ও ২৪ মে জারি করা দুটি সার্কুলারের নির্দিষ্ট শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে পুনঃতফসিল করা ‘মন্দ’ ও ‘ক্ষতিজনক’ ঋণও এই সুবিধার আওতায় আসবে। পাশাপাশি বিশেষ এক্সিট সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ ও সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এই নির্দেশনা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
তবে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত আর্থিক সংকটে পড়া ব্যবসায়ীদের জন্য এ ধরনের বিশেষ সুবিধা ইতিবাচক হতে পারে। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা যাতে এর অপব্যবহার করতে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অন্যথায় নিয়মিত ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহ তৈরি হয়ে ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ এখন খেলাপি, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সেই হিসাবে চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা এবং এক বছরের ব্যবধানে এক লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল চার লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৪.১৩ শতাংশ।