ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক এক সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই সহকারী প্রকৌশলীর নাম মো. জাফর আহমেদ। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপুল অর্থ, ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের আরিফাবাদ হাউজিংয়ে অবস্থিত ১ নম্বর রোডের হাউজ নম্বর এল-০৬ ‘সানাম ভিলা’ নামের ছয় তলা বাড়িটি বাড়িয়ে সাড়ে সাততলা করতে গেলেই ওই কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য সবার সামনে আসে।
সূত্রমতে, সামান্য বেতনের কর্মকর্তা ছিলেন সাবেক সহকারী প্রকৌশলী জাফর। তার ক্ষমতার উৎস কোথায়—তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। এত এত দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে এতদিন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। তবে এই সরকারের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তার শাস্তি হবে বলেই আশা করছেন অনেকে।
একাধিক স্থানীয় সূত্র জানায়, ইঞ্জিনিয়ার জাফর, পেশায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক সহকারী প্রকৌশলী হলেও নামে-বেনামে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে তার একাধিক বাড়ি এবং ফ্ল্যাট। সম্প্রতি রাজউকের কোনো পরিকল্পনা পাশ ছাড়াই ‘সানাম ভিলা’র বাড়িটি ছয় তলা থেকে সাড়ে সাততলায় উন্নীত করার চেষ্টা করছেন তিনি। এ নিয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ দেন স্থানীয় এক এলাকাবাসী। এরপরই তার একাধিক দুর্নীতির তথ্য একে একে সামনে আসে। গত বছরের ২৫ নভেম্বর রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর এসব বিষয়ে অভিযোগও দেওয়া হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দাখিল করে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। চলতি বছরের গত ১ জানুয়ারি দুদকে এই অভিযোগটি দেওয়া হয়। কিন্তু দুদক ও বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসনে এই কর্মকর্তার একাধিক লোক থাকায় অদৃশ্য কারণে সেসব অভিযোগ কেবল অভিযোগই রয়ে যায় বলেও জানিয়েছে সূত্র। তবে সম্প্রতি রাজউক কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া এক অভিযোগ দায়েরে সফল হয়েছেন এক অভিযোগকারী। রাজউকের পরিকল্পনাহীন ছয়তলা বাড়িটি সাড়ে সাততলায় উন্নীত করার কাজ সরেজমিনে তদন্ত করে বন্ধ করে দেয় রাজউক কর্তৃপক্ষ। এই প্রক্রিয়াতে রাজউকের জোন-৩-এর অথরাইজেশন অফিসার মাসুক আহমেদ পরিদর্শক পাঠিয়ে ওই বাড়ির কাজ বন্ধ করেছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সানাম ভিলার বাড়িটি তিনতলা থাকা অবস্থায় গত ৫ মাস আগেই সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে কিনে নেন ইঞ্জিনিয়ার জাফর। কিন্তু বাড়িটির মূল্য কাগজে-কলমে উল্লেখ রয়েছে আড়াই কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার জন্যই জমির প্রকৃত মূল্য গোপন করেছেন ইঞ্জিনিয়ার জাফর। যদিও রাজউকের পরিকল্পনা অনুযায়ী বাড়িটি ছয়তলা করার অনুমতি রয়েছে। বাড়ির পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো- গ, ৩৪-০১২৯) ছাড়াও আরো একাধিক গাড়ির কথা জানা যায়।
শতকোটি টাকার সম্পত্তি ইঞ্জিনিয়ার জাফরের
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, মিরপুর শেয়ালবাড়ী এলাকায় অবস্থিত ৭ নম্বর লিংক রোডের ছয়তলা আরিফা ভিলার বাড়িটিও ইঞ্জিনিয়ার জাফরের। এছাড়াও এই বাড়িটির আশেপাশেই নয়তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ির নবম তলায় প্রাসাদতুল্য একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন তিনি। এই বাড়ির ফ্ল্যাটটিও তার নিজের। বাড়িটির ডিজাইন প্রেসিডেনশিয়াল সুইট সমতুল্য। প্রাসাদতুল্য এই ফ্ল্যাটটির বর্তমান মূল্য ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু রেজিস্ট্রি মূল্য দেখানো হয়েছে আড়াই কোটি টাকা, এখানেও সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার জাফর।
জানা গেছে, জাফরের বড় ছেলে আমেরিকায় থাকেন সপরিবারে। ২০১৯ সালে তিনি কয়েক কোটি টাকা খরচ করে তার বড় ছেলেকে সপরিবারে আমেরিকায় পাঠান। ওই ছেলের মাধ্যমেই বাংলাদেশ থেকে হুণ্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে সেই টাকাই আবার রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে এনে কালো টাকা সাদা করার একটি কৌশলও করেছেন ইঞ্জনিয়ার জাফর। ছোট ছেলে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা।
ইঞ্জিনিয়ার জাফরের রূপনগর থানাধীন ‘সানাম ভিলা’ নামের আরিফাবাদ হাউজিংয়ের বাড়িটির বর্তমান মূল্য সাড়ে ৩ কোটি টাকা। এছাড়া রূপনগর আবাসিক মোড়ে রয়েছে তার আরও তিনটি ফ্ল্যাট, যার আনুমানিক মূল্য তিন কোটি টাকা। মিরপুরে ঢাকা কমার্স কলেজের আশেপাশে তার আরও রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা। এছাড়া উত্তরায় রয়েছে লাক্সারি দুটি ফ্ল্যাট ও একটি তিন তলা ভবন এবং পাঁচ কাঠার একটি প্লট। তার গ্রামের নিজ এলাকায় নোয়াখালী জেলার পশ্চিম মাইজদীতে রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ বিঘা সম্পত্তি, যার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। তার নিজ শহরে রয়েছে ১০ কাঠার উপরে নির্মিত আধাপাকা মার্কেট, যার আনুমানিক মূল্য ১২ কোটি টাকা। এছাড়া তার নামে-বেনামে রয়েছে আরও ৪ থেকে ৫টি ফ্ল্যাট ও বাড়ি। এই ইঞ্জিনিয়ার জাফরের স্ত্রী, পুত্র, সন্তানদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআরসহ সঞ্চয়পত্র রয়েছে প্রায় কয়েক কোটি টাকার।
এছাড়াও, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকৌশলী জাফর তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনদের নামে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার সম্পত্তি করেছেন।
সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। দেখা যায়, মিরপুরের আরামবাগ এলাকায় অবস্থিত আরিফাবাদ হাউজিংয়ে অবস্থিত ১ নম্বর রোডের হাউজ নম্বর এল-০৬ ‘সানাম ভিলা’ বাড়িটি ছয়তলা বিশিষ্ট। বাড়িটি এখনো নির্মাণাধীন অবস্থায় থাকলেও দৃশ্যমান কোনো কাজ চলমান নয়।
‘সানাম ভিলা’র তত্ত্বাবধায়ক নোয়াখালী জেলার পশ্চিম মাইজদী এলাকার বাসিন্দা সোহাগ জানান, সানাম ভিলার এই বাড়িটিতে জাফরের ব্যাংকার ছেলে বসবাস করেন। জাফরের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে ও এক ছেলে বিদেশে থাকেন।
আরিফা ভিলার বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ইঞ্জিনিয়ার জাফরের মেয়ে বাড়িটিতে বসবাস করেন বলে জানান তত্ত্বাবধায়ক সোহাগ। তবে জাফর তার স্ত্রীসহ বসবাস করছেন শেয়ালবাড়ি এলাকার ঢাকা কমার্স কলেজের উল্টো পাশে অবস্থিত দারুল আমান হাউজিংয়ের পার্ক-১৬ নামক একটি নয়তলা বাড়ির নবম তলায়।
সানাম ভিলার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের জোন-৩-এর অথোরাইজেশন অফিসার বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরে আবার ফোন করা হলে তিনি বলেন, জোন-৩-এ তিনটি ভাগ রয়েছে। আরামবাগ এলাকাটি আমার এলাকা নয়।
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিটি করপোরেশনের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী জাফর আহমেদকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়। একবার ফোন ধরে প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়েই তিনি ‘ডাক্তারের সামনে আছেন’—বলে লাইনটি কেটে দেন। পরে ফোন করেও আর তাকে পাওয়া যায়নি।