পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন অরণ্যে দীর্ঘদিনের অশান্তির ইতিহাসে নতুন এক আতঙ্কের নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমী, ম্রো ও খিয়াং, এই ছয়টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের কথিত লক্ষ্য নিয়ে নাথান বমের নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটি এখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য ২০ হাজার সেট সামরিক পোশাক তৈরির বিশাল প্রস্তুতির খবরটি তাদের সাংগঠনিক শক্তির গভীরতা প্রকাশ করেছে।
কিন্তু এই সংবাদের চেয়েও বেশি চাঞ্চল্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ এক ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা, যেখানে কেএনএফ-এর পোশাক জব্দের মামলার প্রধান আসামি সাজেদুল ইসলাম উচ্চ আদালতকে ধোকা দিয়ে কারামুক্ত হয়েছেন।
কেএনএফ-এর এই সশস্ত্র তৎপরতার সমান্তরালে বিচার বিভাগে যে জালিয়াতির চিত্র ফুটে উঠেছে, তা মূলত একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, আসামিপক্ষ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হাইকোর্টে তথ্য গোপন করে জামিন হাসিল করে। জালিয়াতির প্রক্রিয়াটি ছিল রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো, প্রথমে তথ্য গোপন করে জামিন আদেশ নেওয়া হয় ও পরে বিচারপতি স্বাক্ষরিত মূল আদেশের নথিতে থাকা মামলার নম্বর ও থানার নাম অত্যন্ত সুচারুভাবে বদলে ফেলা হয়। নতুন করে তৈরি করা এই জাল জামিন আদেশটি কারাগারে দাখিল করে আসামি মুক্তি পেতে সক্ষম হন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি বিচার ব্যবস্থার প্রশাসনিক স্তরে কতটা ছিদ্র রয়েছে, তা নগ্নভাবে উন্মোচিত করে দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চ আদালতে এই জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় সাত মাস আগে। কিন্তু বিষয়টি দীর্ঘদিন ধামাচাপা ছিল। চলতি সপ্তাহে যখন অন্য এক আসামি একই কায়দায় জামিন নিতে যায়, তখনই পুরো জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জালিয়াতির এই সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এই ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী (২৯ এপ্রিল) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। একজন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যের এভাবে মুক্ত হয়ে যাওয়াকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে কুকি-চিন বা বম পার্টির এই তৎপরতার শেকড় বেশ গভীরে। নাথান বমের নেতৃত্বে ২০০৮ সালে গঠিত হলেও ২০১৭ সাল থেকে তারা বর্তমান রূপে সক্রিয় হতে শুরু করে। তাদের সশস্ত্র শাখা 'কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি' (কেএনএ) পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। মাইন পুতে রাখা, ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা পাহাড়কে অশান্ত করে তুলছে। বিশেষ করে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’-এর সঙ্গে তাদের যোগসাজশ ও দুর্গম পাহাড়ে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর তাদের বিপজ্জনক রূপটি সবার সামনে স্পষ্ট হয়।
বিএনপি সরকারের আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বারবার নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। যদিও কেএনএফ সাম্প্রতিক সময়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তবে তাদের পরিকল্পনার পেছনে অনেক পুরোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে। তারা শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, মিয়ানমারের চিন রাজ্য এবং ভারতের মিজোরাম ও মণিপুরের কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের জাতিগত ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এই আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে তারা পাহাড়ে একটি ‘স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ বা পৃথক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে, যা বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার পরিপন্থী।
সশস্ত্র এই গোষ্ঠীর তৎপরতা ও আদালতের নথি জালিয়াতির ঘটনা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যখন একটি গোষ্ঠী বাইরে সশস্ত্র যুদ্ধ চালায়, তখন তাদের একটি শক্তিশালী সেল ভেতরে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থাকে ধ্বংস বা ব্যবহার করার চেষ্টা করে। সাজেদুল ইসলামের মতো দুর্ধর্ষ আসামির মুক্তি পাওয়া প্রমাণ করে যে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব কেবল পাহাড়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা শহরের উচ্চ আদালত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এটি একটি সমন্বিত ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে যা দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে একযোগে হুমকির মুখে ফেলেছে।
কেএনএফ-এর এই সশস্ত্র উত্থান ও বিচার বিভাগে জালিয়াতির ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। এটি একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশ। প্রধান বিচারপতি নির্দেশিত ৪৮ ঘণ্টার তদন্তে যদি এই জালিয়াতির পেছনের কারিগরদের চিহ্নিত করা না যায় ও পাহাড়ে কেএনএফ-এর সরবরাহ চেইন বন্ধ করা না হয়, তবে এই নীরব সংকট আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করবে। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই নীরব ষড়যন্ত্রের মূল্য দিতে হবে পুরো দেশকে।