শেকড়ে ফেরার চেষ্টা
আকাশে শরতের পূর্ণিমার চাঁদ, নিচে গ্রামের উঠোনে মাদুর পেতে বসেছেন দর্শকেরা। সামনে জলচৌকিতে বসেছেন একজন পাঠক। হারিকেন আর কুপির বাতির আলোয় এক মায়াময় পরিবেশ। চারপাশে সুনসান নিরবতা। আলো আঁধারীর মাঝে ভেসে আসছে পুঁথির সুর।
কয়েক দশক আগে হারিয়ে যাওয়া এমন দৃশ্যের দেখা মিলল চলনবিল বিধৌত পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া গ্রামে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে ওই গ্রামের প্রয়াত কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠোনে বসেছিল বাংলার লোকজ ঐতিহ্য পুঁথি পাঠের আসর। শহরের কোলাহল ছেড়ে নিস্তব্ধ রাতে যেন ধরা দিয়েছিল বাংলার মাটির সৌন্দর্য।
বাড়ির উঠানে একপাশে খড়ের পালা, অন্যপাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। মাথার উপর আলো ছড়িয়েছে চাঁদ। জ্বলছে হারিকেন ও কুপি বাতি।
রাত সোয়া নয়টা থেকে শুরু হয়ে পুঁথি পাঠের আসর চলেছে রাত সোয়া দশটা পর্যন্ত। তার আগে উঠোনে পাতা মাদুরে বাড়তে থাকে গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশু কিশোর, তরুণ তরুণী দর্শকের সংখ্যা। শুধু চাটমোহর উপজেলার নয়, ঢাকা থেকেও আসেন সংস্কৃতিপ্রেমি মানুষজন।
বিপ্লব আচার্য্যরে সঞ্চালনায় শুরুতে পুঁথি পাঠের মুখবন্ধ পাঠ করেন আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক। এরপর শুরু হয় পুঁথি পাঠ। আসরে বিবি সোনাভান পুঁথি পাঠ করেন ৯০ দশকের নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল। গাজী কালু ও চম্পাবতী পুঁথি পাঠ করেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক। শেষে তাদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন আয়োজকরা।
গায়েন তার সুরের জাদুতে মাতিয়ে রাখেন দর্শক শ্রোতাদের। জোসনা রাতে মুগ্ধতায় ভাসেন সবাই। ছোটবেলায় দাদা-দাদির মুখে গল্প শোনা পুঁথি পাঠের আসর স্বচক্ষে দেখে আপ্লুত দর্শক শ্রোতারা।
পুঁথি পাঠ শুনতে এসেছিলেন সত্তোর্ধ কৃষক হাসান প্রামানিক। তিনি বলেন, ‘৪০ বছর আগে শুনেছিলাম। তখন মুরুব্বীরা আয়োজন করতো। ভালই লাগতো। আমরা কৃষিকাজ করতাম। অবসরে আসরে বসে পুঁথি শুনতাম। এত বছর পর আয়োজনটা ভালই লাগলো।’
ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হক। তার ভাষ্য, ‘স্কুলে পড়ার সময় নানা বাড়িতে বৈঠকখানায় এরকম পুঁথি পাঠের আসর বসতো। এত বছর পর পুঁথি পাঠ শুনে সেই ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছিলাম। এখন তো মোবাইলে ডুবে গেছি আমরা। আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে ধরে রাখা দরকার।’
ফয়সাল মাহমুদ সদ্য নামের এক তরুন বলেন, ‘আসলে পুঁথি পাঠ কি আমি জানতাম না। ফেসবুকে আয়োজনের প্রস্তুতি দেখে ডা. আতিককে ফোন করে জেনেছি। আগে কখনো দেখিনি। তাই আব্বুর সাথে পুঁথি পাঠ দেখতে এসে খুব ভালো লাগলো।’
চাটমোহর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন বলেন, ‘যখন সারা পৃথিবী এআই প্রযুক্তিতে ডুবে আছে, সেখানে এই পুঁথি পাঠের আসর আয়োজন একটি বিরল ঘটনা। কারণ শত শত বছরের ঐতিহ্য আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। আমাদের পরিচয় হলো আদি সংস্কৃতি, তারই অংশ পুঁথি। এটাকে ধরে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।’
পুঁথি পাঠ করতে পেরে নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল বলেন, ‘আগে যখন গ্রামে পুঁথি পাঠ শুনতাম তখন থেকেই সুরটা আমার মধ্যে ছিল। আমি পাঠক না হলেও আজ প্রথম পাঠ করলাম। আমার মনে হলো, মানুষের মধ্যে একাত্মতাবোধ তৈরী ও পাশাপাশি আনতে পুঁধিপাঠের মতো গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো ধরে রাখতে হবে। এখনকার গল্প দিয়ে যদি পুঁথি বাধা যায় তাহলে মানুষকে সুন্দর পথের স্বপ্ন দেখানো সম্ভব।’
আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘আমাদের বর্ণালী একটা সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। তার অন্যতম অংশ পুঁথি। সেই ১৬-১৭ শতকের। ৮০-৯০ সাল পর্যন্ত নিভু নিভু করে জ্বলেছে। বর্তমানে একদমই বিলুপ্ত প্রায় একটি সংস্কৃতি। অনেকে জানেই না এই পুঁথি পাঠ টা আসলে কী। আমরা ফিরতে চেয়েছি সেই সময়ে, দেখতে চেয়েছি কেমন ছিল পুঁথি পাঠের আসর। মুলত সেই হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরতে এই আয়োজন।’
পুঁথি পাঠের আসরের খবর জানতে পেরে ঢাকা থেকে দেখতে এসেছিলেন পাঁচবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ। তার ভাষ্য, ‘খুবই ভাল একটি আয়োজন। নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এখন যদি পুঁথি পাঠ টাকে জনপ্রিয় ও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চান তাহলে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নতুন করে গল্প তৈরী করতে হবে। যাতে মানুষের শোনার আগ্রহ বাড়ে। তাহলে এটাকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, সার্কাস, পুঁথি পাঠ ছিল গ্রামীণ জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ভিন্ন সংস্কৃতি চর্চা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন বিলুপ্ত প্রায়। লোকজ এই ঐতিহ্যগুলো ধরে রাখতে সরকারের পদক্ষেপ দাবি সংশ্লিষ্টদের।