ভোরের আলো ফুটতেই কাস্তে হাতে মাঠে নামছেন কৃষক। কেউ পাট কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন, কেউ আবার কাঁধে করে পাট নিয়ে যাচ্ছেন খাল-বিল ও জলাশয়ে। কোথাও চলছে পাট জাগ দেওয়া, কোথাও আবার আঁশ ছাড়ানোর কাজ। এতে গ্রামীণ জনপদে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাদারীপুরে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, আগাছা পরিষ্কার, সেচ এবং শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। তার ওপর বাজারে পাটের দাম প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় লাভ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা।
জেলার শিবচর, কালকিনি, রাজৈর, ডাসার ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার কাজে ব্যস্ত কৃষকরা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দিনমজুররাও যুক্ত হয়েছেন পাট কাটার কাজে। ফলে কৃষিকাজকে ঘিরে গ্রামাঞ্চলে তৈরি হয়েছে বাড়তি কর্মসংস্থান।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বিবেচনায় এ দামকে সন্তোষজনক মনে করছেন না তারা। তাদের দাবি, প্রতি মণ পাটের দাম কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা হলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কিছুটা লাভের মুখ দেখা সম্ভব হবে।
কৃষক সুরুজ আলী বলেন, ‘এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু পাট চাষ করতে জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন পাট কাটতে ও জাগ দিতে আবার শ্রমিক লাগছে। সব খরচ হিসাব করলে বর্তমান বাজারদরে তেমন লাভ থাকে না। প্রতি মণ পাট অন্তত ৫ হাজার টাকা হলে আমরা ভালোভাবে লাভ করতে পারব।’
কৃষক আকতার মৃধা বলেন, ‘পাটের ফলন এবার সত্যিই ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম কম থাকায় সেই আনন্দ নেই। আমরা সারা বছর পরিশ্রম করে পাট ফলাই। উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে। তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি, কৃষকের খরচ ও পরিশ্রমের কথা বিবেচনা করে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক।’
কৃষক জলিল উদ্দিন বলেন, ‘পাট ভালো হয়েছে, কিন্তু দাম নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। বাজারে এখন যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে খরচ বাদ দিয়ে খুব বেশি লাভ হচ্ছে না। পাটের দাম যদি ৫ হাজার টাকা মণ হয়, তাহলে কৃষক কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং আগামী বছরও পাট চাষে উৎসাহিত হবে।’
মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলার পাঁচ উপজেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৩৭ হাজার ৫৬ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১৩১ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের মধ্যে পাট চাষে আগ্রহ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের পরিচর্যায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, ফলে কিছুটা দাম কমেছে।
মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. রহিমা খাতুন বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা অনেক কৃষককে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়েছি। এতে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ ও উৎসাহ বেড়েছে। এ বছর পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে এবং ফলনও বাম্পার হয়েছে। যেহেতু ফলন বেশি হয়েছে, তাই বাজারে পাটের সরবরাহও বেশি। সে কারণে এবার দাম কিছুটা কম। তবে বর্তমানে যে দামে পাট বিক্রি হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচের তুলনায় কৃষকরা বেশি দামই পাচ্ছেন। ফলে কৃষকদের লোকসান হওয়ার আশঙ্কা নেই।’
পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদীবেষ্টিত মাদারীপুরের পাটের গুণগত মান ঐতিহ্যগতভাবেই ভালো। তাই উৎপাদন ও মানের দিক থেকে সম্ভাবনাময় এ জেলার পাট কৃষকের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বাম্পার ফলনের সুফল কৃষকের ঘরে কতটা পৌঁছাবে, সেটি অনেকটাই নির্ভর করছে বাজারদরের ওপর।
ফলন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় থাকা পাটচাষিদের প্রত্যাশা—উৎপাদন খরচ ও শ্রমের যথাযথ মূল্য বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাহলেই সোনালি আঁশের বাম্পার ফলন সত্যিকার অর্থে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে।