আগুন শুধু দুটি ঘর পুড়িয়ে দেয়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে স্বামীহারা মঞ্জু বেগমের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও। গভীর রাতে আগুনে পুড়ে মারা গেছে তার প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের দুটি গরু। সঙ্গে পুড়ে গেছে কাঠ-লাকড়ি রাখার ঘর ও গরুর ঘর। সব মিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষতিতে এখন একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার রমজানপুর ইউনিয়নের ২৪ ঘর এলাকার এই বিধবা নারী।
জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে মঞ্জু বেগমের স্বামী মনির হাওলাদার মারা গেছেন। এরপর এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালিয়ে আসছিলেন মঞ্জু। নিজের কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস ছিল না। মানুষের সহায়তার পাশাপাশি দুটি গরু পালন করেই চলত তার সংসার। সেই গরু দুটিই ছিল ছোট ছেলের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ মেটানোর প্রধান ভরসা।
কিন্তু সোমবার (২৪ আগস্ট) গভীর রাতে হঠাৎ আগুনে শেষ হয়ে যায় তার সেই স্বপ্ন। ভোরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দুটি ঘর। গোয়ল ঘরে থাকা দুটি গরুও পুড়ে মারা গেছে।
আগুন নেভার পর পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাক হয়ে যান মঞ্জু। যে দুটি গরুকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে বড় করেছিলেন, সেই গরুগুলোর পোড়া দেহের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে যেন নিজের ভবিষ্যৎটাই দেখছেন তিনি।
মঞ্জু বেগমের বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অনেক কষ্টে। ছোট ছেলে এখনো পড়াশোনা করছে। তার পড়াশোনার খরচ, খাবার ও সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে ওই দুটি গরুই ছিল মঞ্জুর প্রধান অবলম্বন। গরু দুটি বিক্রি করে কিংবা সেগুলো থেকে আয় করে সংসার চালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। আগুনে সেই স্বপ্নও পুড়ে ছাই হয়েছে।
স্বামীহারা এই নারী এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তায় পড়েছেন ছোট ছেলের পড়াশোনা আর দুবেলা খাবার নিয়ে। কীভাবে আবার সংসার দাঁড় করাবেন, কোথা থেকে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাবেন—কোনো উত্তরই জানা নেই তার।
স্থানীয়রা জানান, আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে রান্নাঘর ছিল না। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের সম্ভাবনাও নেই বলে দাবি তাদের। এ কারণে কেউ কেউ ঘটনাটি নাশকতা বা দুর্বৃত্তদের আগুন দেওয়ার ঘটনা হতে পারে বলে সন্দেহ করছেন। তবে প্রকৃত কারণ তদন্তের পরই জানা যাবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রমজানপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক স্বপন মোল্লা। তিনি বলেন, ‘আমি কয়েকবার ঘটনাস্থলে এসেছি। বোবা প্রাণীগুলোকে যারা এভাবে পুড়িয়ে মেরেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত। কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ঘটনাটি দেখলে চোখে পানি চলে আসে। আমরা অসহায় পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করব।’
রমজানপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলী আকবর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে যত ধরনের সহযোগিতা করা সম্ভব, তা করার চেষ্টা করব। পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও পরিবারটির পাশে দাঁড়াব। সমাজের বিত্তবানদেরও এই অসহায় পরিবারের পাশে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।’
ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রফিক খান বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা আমাদের জানা নেই। তাদের কান্না দেখে আমাদেরও খুব খারাপ লাগছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কেউ এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কালকিনি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবারটি উপজেলা সমাজকল্যাণ পরিষদে আবেদন করলে নিয়ম অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।’