গত কয়েক বছর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ফলন বিপর্যয় ও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছিলেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার চাষিরা। তবে চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। ফলন আশানুরূপ হওয়া এবং তুলনামূলক বাজারদর ভালো পাওয়ায় এবার পাট চাষে লাভের আশা করছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে হালচাষ, সার, কীটনাশক, নিড়ানী, পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বিপরীতে অনেক সময় উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় লোকসান গুনতে হয়েছে। ফলে উপজেলার অনেক কৃষক পাটের আবাদ কমিয়ে অন্য ফসল চাষে ঝুঁকেছিলেন।
উপজেলার আয়মা রসুলপুর ইউনিয়নের পূর্ব কড়িয়া গ্রামের কৃষক নুরুল আমিন নওশাদ প্রতিবছর ৩ থেকে ৪ একর জমিতে পাট চাষ করতেন। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় কয়েক বছর ধরে তিনি আবাদ কমিয়ে দেন। চলতি মৌসুমে মাত্র এক একর জমিতে পাট চাষ করেছেন।
নুরুল আমিন নওশাদ বলেন, ‘গত কয়েক বছর পাট চাষ করে তেমন লাভ হয়নি। খরচ বাড়লেও দাম পাওয়া যায়নি। তাই আবাদ কমিয়ে দিয়েছিলাম। তবে এবার বাজারে ভালো দাম থাকায় পাট চাষ করে লাভবান হওয়ার আশা করছি।’
ধরঞ্জী গ্রামের পাটচাষি নুরুল ইসলাম এবার দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি বলেন, হালচাষ, নিড়ানী, সার-কীটনাশক, পাট কাটা ও আঁশ ছাড়ানোসহ প্রতি বিঘায় প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতি বিঘায় ফলন হচ্ছে প্রায় ৮ থেকে ১০ মণ।
তিনি বলেন, ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি বাজারে বর্তমানের মতো দাম থাকলে খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভ থাকবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের শুরুতে পুরোনো পাট প্রতি মণ ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা এবং নতুন পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। তবে কৃষকের ঘরে নতুন পাট ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে।
বর্তমানে পাঁচবিবি বাজারে মান ও ধরনভেদে প্রতি মণ পাট প্রায় ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকার ফরিয়ারা কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকা দরে পাট কিনছেন।
তবে ভালো বাজারদরের মধ্যেও ফরিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে কৃষকদের। তাদের দাবি, পাট কেনার সময় ‘ধলতা’ বা অতিরিক্ত ওজনের নামে প্রতি মণে প্রায় এক কেজি বেশি পাট নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রকৃত বিক্রয়মূল্য থেকে কিছুটা বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জসিম উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে পাঁচবিবি উপজেলায় ১ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার পাটের ফলন আশানুরূপ হয়েছে। বাজারদরও তুলনামূলক ভালো থাকায় কৃষকেরা পাট বিক্রি করে প্রত্যাশিত আয় করতে পারবেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাজারদর কৃষকদের অনুকূলে থাকলে আগামী মৌসুমে পাঁচবিবিতে পাটের আবাদ আবারও বাড়তে পারে। এতে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল পাটের উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনাও আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।