স্বামীকে বাঁচাতে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতছেন দোলেনা বেগম। কখনো গ্রামে, কখনো শহরে, আবার কখনো হাট-বাজারে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে সামান্য সাহায্য নিয়ে স্বামীর ওষুধ কিনছেন তিনি। নিজের শেষ সম্বল একটি গরুও বিক্রি করেছেন। তবু স্বামীর হার্টের অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় তিন লাখ টাকা জোগাড় করতে পারছেন না।
বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের পাছোলি গ্রামের ৬০ বছর বয়সী বাবর আলী পেশায় রাজমিস্ত্রি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালাতেন তিনি। কিন্তু গত নয় মাস ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার হার্টের অপারেশন প্রয়োজন। এতে প্রায় তিন লাখ টাকা লাগবে। অথচ প্রতি মাসে সাড়ে চার হাজার টাকার ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই পরিবারটির।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নয় মাস আগে রাতে খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাওয়ার পর হঠাৎ বাবর আলীর প্রচণ্ড কাশি শুরু হয়। বারান্দায় গিয়ে চেয়ারে বসার পর তিনি বমি করতে থাকেন। একপর্যায়ে শুরু হয় রক্তবমি। দ্রুত তাঁকে ফকিরহাট হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও অর্থের অভাবে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরে স্থানীয় একটি সমিতির মাধ্যমে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে তার চিকিৎসা শুরু করা হয়। ধার-দেনা, মানুষের সহযোগিতা ও নিজেদের শেষ সম্বল বিক্রি করে এতদিন কোনোভাবে চিকিৎসা চালানো হলেও এখন পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব। আবু নাছের হাসপাতালে বাবর আলীর জন্য বেডের ব্যবস্থা হলেও অর্থের অভাবে তাঁকে সেখানে ভর্তি করাতে পারেনি পরিবার।
দোলেনা বেগম বলেন, ‘স্বামীকে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য আমার ছিল না। এখন তার ওষুধ কেনার টাকাও নেই। নয় মাস ধরে আমার স্বামী বিছানায় পড়ে আছে। কোথাও থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাইনি। ছেলেও সমিতি থেকে টাকা ধার করে বাবার চিকিৎসা করিয়েছে। সেই টাকা এখন কিস্তিতে পরিশোধ করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘একবেলা ওষুধ না খেলে আমার স্বামীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকার ওষুধ লাগে। তাই বাধ্য হয়ে গ্রাম-শহরের বিভিন্ন জায়গা ও হাট-বাজারে গিয়ে মানুষের কাছে হাত পাতি। কেউ ২০ টাকা দেন, কেউ ৫০ টাকা দেন, আবার কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন। সেই টাকা দিয়ে স্বামীর ওষুধ কিনি। আমার একটি গরু ছিল, সেটিও বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ চালিয়েছি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোলেনা আরও বলেন, ‘ডাক্তার বলেছেন, আমার স্বামীর হার্টের অপারেশন করতে হবে। অপারেশনের জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমার কাছে এখন তিন টাকাও নেই। আমি মানুষের কাছে হাত পেতে স্বামীর ওষুধের টাকা জোগাড় করছি। তিন লাখ টাকা কোথায় পাব? আমি আমার স্বামীকে বাঁচাতে চাই। সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে হয়তো আমার স্বামীকে বাঁচানো সম্ভব হবে।’
বাবর আলীর পুত্রবধূ শিউলি বেগম বলেন, ‘আমার শ্বশুর অনেক দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তাকে বাঁচাতে পরিবারের যা কিছু ছিল, সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কিস্তি দেব, নাকি শ্বশুরের ওষুধ কিনব—সেই চিন্তায় আছি। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। প্রতি মাসে সাড়ে চার হাজার টাকার ওষুধ লাগে। কিস্তি দিতে পারছি না, ওষুধও কিনতে পারছি না। মানুষের কাছে আমাদের একটাই দাবি—আমার শ্বশুরের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।’
বাবর আলীর মেয়ে খুকু মনি বলেন, ‘আমার আব্বু দীর্ঘদিন ধরে খুব অসুস্থ। নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানোর মতো টাকাও আমাদের নেই। আমিও অসুস্থ। আমরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি। আমার আব্বুকে বাঁচাতে সবাই সহযোগিতা করুন।’
স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা শেখ বলেন, ‘বাবর আলী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন। তার পরিবারটি খুবই অসহায়। স্ত্রী মানুষের কাছে সাহায্য নিয়ে স্বামীর ওষুধ কিনছেন। আমরা স্থানীয়ভাবে যতটুকু পারছি সহযোগিতা করছি। কিন্তু হার্টের অপারেশনের জন্য যে পরিমাণ টাকা প্রয়োজন, তা এই পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে বাবর আলীর চিকিৎসা করানো সম্ভব হবে।’
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনাজ পারভীন বীথি বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। পরিবারটির বর্তমান অবস্থা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখব। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কী ধরনের সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদেরও অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।’
নয় মাস ধরে অসুস্থ স্বামীকে বাঁচাতে একাই লড়াই করে যাচ্ছেন দোলেনা। স্বামীর ওষুধ কেনার জন্য দ্বারে দ্বারে হাত পাততে হলেও তাতে তার কোনো সংকোচ নেই। কারণ নিজের সম্মানের চেয়েও এখন তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে স্বামীর জীবন।
প্রতি মাসে সাড়ে চার হাজার টাকার ওষুধের খরচের পাশাপাশি হার্টের অপারেশনের জন্য প্রয়োজন প্রায় তিন লাখ টাকা। বিপুল এই অর্থের সংস্থান করা দরিদ্র পরিবারটির পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাবর আলীর চিকিৎসা চালিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবান, মানবিক ও সহৃদয় মানুষের কাছে সহযোগিতার আকুল আবেদন জানিয়েছে পরিবারটি।