‘আমাদের ভবিষ্যৎ বলে এখন আর কিছুই নাই। এখন ভগবান যা করেন...।’ কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের বাবা দিলীপ দত্ত। একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দিনগত রাত ২টার দিকে ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৮), তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৯), তিন বছরের ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬৪) নিহত হন।
ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে দিলীপ দত্ত বলেন, “ঘটনার আগের রাতেও ওর মা ও মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। ওরা বলছিল, ‘আমরা রেডি, লাগেজ-টাগেজ গুছিয়েছি। ব্যাগ-ট্যাগ রেডি করতেছি। আমরা সকালে চলে আসব।’ কিন্তু সেই সকাল আর আসেনি। দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েও আর স্ত্রী-সন্তান ও শ্বশুরকে নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেনি দেবাশীষ।”
দিলীপ দত্ত জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ ছিলেন দেবাশীষ। তার নিজের মাসে প্রায় চার হাজার টাকা এবং দেবাশীষের মায়ের প্রায় পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন হয়। ছেলের আয়ের ওপরই নির্ভর করত পুরো পরিবার।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে দেশে ফেরার কথা ছিল দেবাশীষদের। দেশে ফিরে শুক্রবার অসুস্থ মাকে নিয়ে রাজশাহীতে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তার। মাকে সুস্থ করার সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবে রূপ নিল না।
উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে যান দেবাশীষ। কলকাতার পাশাপাশি চিকিৎসার প্রয়োজনে তারা বেঙ্গালুরুও গিয়েছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের দিন রাতে বেঙ্গালুরু থেকে বিমানে কলকাতায় ফেরেন তারা। পরদিনই দেশে ফেরার কথা ছিল পরিবারের। কিন্তু তার আগেই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে সব শেষ হয়ে যায়।
ভারতের সংবাদমাধ্যম পিটিআই ও এনডিটিভির প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই আবাসিক হোটেলে রাতে আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডে আট বাংলাদেশি নাগরিকসহ কয়েকজন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
নিহত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। কর্মজীবনে সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল, মেধাবী ও পেশাদার সাংবাদিক।
দেবাশীষ ও তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজের নেতৃবৃন্দ ও সহকর্মীরা।
কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের (কেইউজে) সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দেবাশীষ অত্যন্ত মেধাবী, পেশাদার ও সাদা মনের মানুষ ছিলেন।’
একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে দেবাশীষের কুষ্টিয়ার বাড়িতে এখন শুধু শোক আর কান্না। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। যে মানুষটি মাকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, তিনিই এখন আর ফিরবেন না—এই নির্মম বাস্তবতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও সহকর্মীরা।
প্রিয় সহকর্মীকে হারিয়ে শোকাহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজ। আর দেবাশীষের পরিবার হারিয়েছে শুধু একজন সন্তান বা স্বজনকে নয়—হারিয়েছে তাদের ভরসা, আশ্রয় ও ভবিষ্যতের এক বড় অংশ।