জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় সরকারের গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বাস্তবায়িত আশ্রয়ণ প্রকল্প এখন নানা অব্যবস্থাপনা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কাগজে- কলমে প্রকৃত অসহায়দের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ঘরই ভাড়াটে, জবর দখলকারী ও মাদক কারবারিদের দখলে চলে গেছে। ফলে, সরকারের মহৎ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জনপ্রতিনিধি, তাদের স্বজন, এমনকি স্বচ্ছল ও প্রবাসী পরিবারও ঘর বরাদ্দ পেয়েছে। ১৫৯টি পরিবারের বসবাসের কথা থাকলেও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সমর্থিত অনেক উপকারভোগী এলাকা ছাড়লে তাদের ঘরগুলো প্রতিপক্ষরা দখল করে নেয়।
বর্তমানে অনেক ঘর ভাড়া দেওয়া, তালাবদ্ধ রাখা কিংবা টাকার বিনিময়ে মাদক কারবারিদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো ধীরে ধীরে মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে।
সরেজমিনে জানা যায়, ২০২২- ২৩ অর্থবছরে দুটি প্রকল্পে মোট ১৫৯টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১৯টি সেমিপাকা ও ৪০টি টিনশেড। মাত্রাই ইউনিয়নের কাঁটাহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫৮টি ঘর বর্তমানে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
প্রকল্পটি এখন মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, যেখানে বহিরাগতদের দখলে থাকা ঘরগুলোতে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলছে।একই প্রকল্পে বরাদ্দপ্রাপ্ত রোকেয়া বেগম, রজ্জব আলী ও ছাইদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, মাদকসেবী ও তাদের সহযোগীরা অনেক ঘর জবরদখল করে রেখেছে।
এছাড়া ৫৫ নম্বর ঘরের উপকারভোগী নুরনবী-কুলসুম দম্পতিকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে উচ্ছেদ করার অভিযোগ রয়েছে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে।
উদয়পুর ইউনিয়নের বিনইল ও উত্তরপাড়ায় আশ্রয়ণ ঘরগুলোতেও বহিরাগতদের আড্ডা, মাদকসেবন ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়রা জানান, বিনইলে দুটি ঘর ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। শ্রীপুর আশ্রয়ণে স্বচ্ছল প্রবাসী পরিবারের বসবাস এবং অনেক ঘর তালাবদ্ধ থাকার চিত্রও পাওয়া গেছে। এছাড়া জিন্দারপুর,ঘাটুরিয়া ও বাদাউচ্চ আশ্রয়ণে থাকা ৬৩টি ঘরের অধিকাংশ ভাড়া বা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পাইকপাড়া ও লকইর আশ্রয়ণের প্রায় ২২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১০টি ঘরের উপকারভোগীরা জেলা শহরে বসবাস করছেন, আর বাকিগুলো প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই চিত্র দেখা গেছে কালাই উপজেলার তালোড়া বাইগুনী পীরপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পেও। এখানে ১৫৯টি ঘরের মধ্যে প্রায় ৮০টি ভাড়াটিয়াদের দখলে।কর্মসংস্থানের অভাবে উপকারভোগীরা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ঘরগুলো খালি পড়ে থেকে মাদকসেবীদের আস্তানায় পরিণত হচ্ছে। আর প্রকৃত মালিকরা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত। ঘুষের মাধ্যমে ঘর বরাদ্দের অভিযোগও রয়েছে।
বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, অনেক স্থানে যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় খেতের আইল দিয়ে চলাচল করতে হয়। বর্ষায় পানি জমে, দেয়াল ফেটে যায় এবং রাতে মাদক কারবারিদের উৎপাত থাকে। রিমি বিবি ও জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক ঘরের দেয়ালে ফাটল, ছাউনি চুঁইয়ে পানি পড়া, সুপেয় পানির সংকট ও নিরাপত্তাহীনতার অভাবে বসবাসের পরিবেশ না থাকায় মানুষকে এসব ঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করছে।
বলায় চন্দ্র রবিদাসের ভাষ্য, কাজ না থাকায় না খেয়ে থাকতে হয়। আশরাফ আলী বলেন, এখানে থাকলে জীবিকা নেই, না থাকলে ঘর নেই। সব মিলিয়ে বাসিন্দারা চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগে রয়েছেন।
পানির সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেশ কিছু নলকূপ চুরি হয়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের দূর থেকে পানি আনতে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা জানান, স্থাপিত নলকূপগুলোর বেশিরভাগই চুরি হয়ে গেছে, অবশিষ্ট পানিতেও আয়রনের আধিক্য থাকায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়েছে। নতুন করে নলকূপ স্থাপন করে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের চুরি না ঘটে সেজন্য স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে নজরদারি জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কালাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাদক সংক্রান্ত এমন নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি। সবেমাত্র এই বিষয়ে আমরা অবগত হলাম। আমরা দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে জবরদখল, ভাড়া ও বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।যারা নিয়ম ভঙ্গ করেছেন তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত গৃহহীনদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং মাদকসহ যেকোনো অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।