রংপুর বিভাগে তীব্র জ্বালানি সংকটের যে চিত্র সামনে এসেছে সেটি বাস্তবে কতটা সত্য— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বলছে, সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও আতঙ্ক, কালোবাজারি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় কালোবাজারি রোধে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ভিজিলেন্স টিম গঠন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ এসেছে। একটি চক্র সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে দাবি করেছেন রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন।
তিনি বলেন, যে একবার তেল নেবে পরের দিন তার আর তেলের প্রয়োজন নেই। কিন্তু, সেও আবার তেল নিয়ে তেলের সংকট তৈরি করছে। একই কথা বলেন পাম্প মালিকরাও।
পেট্রোল পাম্প মালিক, ডিপো কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর এ সময়ে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের যে পরিমাণ চাহিদা ছিল, এ বছর প্রায় দ্বিগুণ চাহিদা রয়েছে।
শুধু তাই নয়, শহর ও উপজেলা পর্যায়ে গত বছর যেভাবে দিন ও মাস হিসাবে জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, এবারও পাম্প মালিকদের প্রায় একই হারে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ফলে কাগজে-কলমে বড় ধরনের ঘাটতির কোনো চিত্র নেই।
তবে সরেজমিন অধিকাংশ পাম্পে তেল না থাকার ঘটনা সামনে আসছে। কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও সীমিত পরিসরে বিক্রি, আবার কোথাও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘সংকট’ নিয়ে আতঙ্ক আরও বেড়ে যাচ্ছে।
পাম্প মালিকরা বলছেন, এ পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা ও কালোবাজারি। তাদের দাবি, একটি চক্র একই মোটরসাইকেল বা অন্য বাহনে করে একাধিক পাম্প থেকে অতিরিক্ত পেট্রল, অকটেন ও জ্বালানি সংগ্রহ করছে। পরে সেই জ্বালানি কালোবাজারে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
একজন পাম্প মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘একই মোটরসাইকেল দিনে কয়েকটি পাম্পে ঘুরে ঘুরে তেল নিচ্ছে। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন এ চক্র চলায় পাম্পের মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, পাম্পে পেট্রল না পাওয়া গেলেও খোলাবাজারে অতিরিক্ত দামে পাওয়া যাচ্ছে। যদিও সেটা প্রকাশ্যে নয়, অতি গোপনে বিক্রি হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, নগরীর অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ‘তেল নেই’, ‘পেট্রল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। কোথাও পাম্প খোলা থাকলেও পেট্রল নেই, কোথাও আবার অকটেন বা ডিজেল নেই। ফলে, কার্যত এসব পাম্প বন্ধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চালকদের অভিযোগ, তেল পেতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন।
রংপুর মিজান পেট্রল পাম্পে মনিরুল ইসলাম নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, ‘সকাল থেকে লাইনে আছি, কিন্তু সামনে গিয়ে শুনি তেল শেষ। একই চিত্র দেখা গেছে রংপুর ও আশপাশের জেলাগুলোতেও। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন তেল না থাকায় বন্ধ থাকছে, আর যেগুলো খোলা রয়েছে সেখানে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন পাম্পে অর্ধ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছে শত শত যানবাহন।’
রংপুর বিভাগ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিভাগের ৮ জেলায় ৩৮০টি পেট্রল পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে রংপুরে ৮৩টি, কুড়িগ্রামে ২২টি, গাইবান্ধায় ২৬টি, লালমনিরহাটে ২৭টি, নীলফামারীতে ৩৮টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৫টি, পঞ্চগড়ে ২৯টি এবং দিনাজপুরে ১২০টি রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব পাম্প গত বছর যে পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করে বিক্রি করেছেন, এবারও সেই চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত জ্বালানি পাচ্ছে, সেগুলো প্রতিদিন সীমিত আকারে গ্রাহকদের সরবরাহ দিতে পারছে। তবে যেসব পাম্পে বরাদ্দ কম বা সরবরাহ অনিয়মিত, তারা যে বরাদ্দ পাচ্ছে, তা চাহিদা বেশি থাকায় দ্রুত বিক্রি শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।’
তার দাবি, গত বছরের তুলনায় এমন কী হলো যে দ্বিগুণ-তিনগুণ জ্বালানি লাগছে? তার উল্টো প্রশ্ন— এত জ্বালানি যাচ্ছে কোথায়? যারা মজুদ করছে, সেই কালোবাজারিদের বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
পাম্প মালিকদের আরেকটি অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পাম্প থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে বিকল্প উপায়ে মজুদ করছে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, বাস্তবে এ বছর যে পরিমাণ মজুদ আছে, তা গত বছরের একই সময়ের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ঘাটতি থাকার কথা নয়। মূলত অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
একাধিক পাম্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে যে পাম্প কর্তৃপক্ষ যত জ্বালানি সংগ্রহ করেছেন, সেই অনুযায়ী এবারও জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। কেউ দিনে এক হাজার লিটার বিক্রি করে মাসে ৩০ হাজার লিটার বিক্রি করলে, তাকেও সেই অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে—হয়তো দুই-একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। তবে কালোবাজারি বন্ধ না করলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
রংপুর রহমান পাম্পের মালিক এবিএম নূর উস সামস বলেন, ‘গত সাত দিন ধরে আমি জ্বালানি উত্তোলন করতে পারছি না। সেই কারণে পাম্পে পেট্রল, ডিজেল ও অকটেন দেওয়া বন্ধ রয়েছে। বরাদ্দ পেলে আবার দেওয়া হবে।’
রংপুর জেলা প্রশাসন বলছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রংপুর জেলায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কম্পানি মিলে ডিজেল মজুদ রয়েছে ১০ লাখ ৭ হাজার ৭৫৪ লিটার, পেট্রল মজুদ আছে ১৭ লাখ ৬ হাজার ৫০০ লিটার এবং অকটেন মজুদ আছে ৪২ হাজার লিটার। জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘এ সংকট কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছি। আগামী রোববার আমরা পাম্প মালিকদের সঙ্গে বসব। একই সঙ্গে অ্যাপ-ভিত্তিক জ্বালানি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছি। এতে করে একজন এক জেলায় তেল নিলে ওই দিন ওই জেলায় আর নিতে পারবে না। এতে কিছুটা সংকট কমে আসবে বলে আশা করি।’
সুজন রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল ইসলাম বেঞ্জু বলেন, ‘সরবরাহ থাকলেও সেটি সঠিকভাবে বণ্টন না হওয়া এবং ভোক্তাদের অতিরিক্ত মজুদের প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।’
তিনি বলেন, ‘রংপুর বিভাগের জ্বালানি পরিস্থিতি একটি জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি— যেখানে সরবরাহ ঠিক থাকলেও আতঙ্ক, কালোবাজারি ও অসাধু মজুদের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত কঠোর নজরদারি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ সংকট আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং জনভোগান্তি বাড়তেই থাকবে।’