মাগুরা জেলায় ডিজেলের ভয়াবহ সংকটে কৃষি ও জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে সরবরাহ বন্ধ থাকায় সেচ কার্যক্রম থমকে গেছে, আর মাঠে ফসল নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকরা। সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনের দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। জেলার প্রায় সবকটি পেট্রোল পাম্পে ‘জ্বালানি তেল নেই’ নোটিশ ঝুলছে। ১২টি পাম্পের মধ্যে মাগুরা পৌর এলাকার ৭টিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও অকটেন, পেট্রোল বা ডিজেল নেই। কিছু পাম্পে অল্প পরিমাণে সরবরাহ এলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন মোটরসাইকেল চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। এতে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষিখাতে। চলতি মৌসুমে মাগুরায় ৩৯ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে, যেখানে সেচের জন্য ২৭ হাজার ৪৯৯টি ডিজেলচালিত যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ডিজেল সংকটে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি না পেয়ে খেতের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
ক্ষুব্ধ কৃষকদের অভিযোগ, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ডিজেল পাই না। জমিতে পানি দিতে পারছি না, ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ তারা আরও জানান, ‘পাট ও তিলের বীজ বপনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব।’
কৃষকদের অভিযোগ, খোলাবাজারে বোতলে করে তেল বিক্রি হলেও প্রকৃত চাষিরা তেল পাচ্ছেন না। এতে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের ইঙ্গিত পাচ্ছেন তারা। মাগুরার ভিটাসাইর এলাকার ‘মেসার্স মা ফাতেমা ফিলিং স্টেশন’সহ অধিকাংশ পাম্প বন্ধ রয়েছে।
পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, ডিপো থেকে কয়েক দিন ধরে পর্যাপ্ত সরবরাহ না আসায় তারা বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। ট্যাংক-লরিগুলো ডিপোতে অপেক্ষা করলেও কবে তেল আসবে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
পাম্প মালিকরা জানান, দুই-তিন দিন পরপর অল্প পরিমাণে জ্বালানি এলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ফলে তেল এলেই অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। টানা কয়েক দিন তেল না পেয়ে অনেকেই যানবাহন চালাতে পারছেন না। কেউ কেউ মোটরসাইকেল ঠেলে পাম্পে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
সদর উপজেলার ফারুক বলেন, ‘তেল না পেয়ে হেঁটে পাম্পে এসেছি। কোথাও তেল নেই। এখন বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সাগর নামের আরেকজন বলেন, ছুটিতে বাড়ি এসে কোথাও যেতে পারছি না-সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।’
সংকটের সুযোগে খোলাবাজারে চড়া দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লিটার দরে পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসন কৃত্রিম সংকট রোধে অভিযান চালিয়ে কিছু জরিমানা করলেও বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বর্তমানে কিছু পাম্পে সীমিত আকারে তেল দেওয়া হলেও একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষক ও সাধারণ মানুষের দাবি-অবিলম্বে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। নইলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।