দিল্লির যন্তর মন্তরে সম্প্রতি তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘ভীষণভাবে দুর্বল’ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন লাদাখের অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক; যার অনশন কর্মসূচি ওই আন্দোলনকে বেগবান করেছিল।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৫৯ বছর বয়সী সোনম বলেন, ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ানো গণবিক্ষোভের পর ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে।
তিনি বলেন, তরুণরা এখন আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী যে তারা ‘চাইলেই পরিবর্তন আনতে পারে’। পাশাপাশি অন্যায়ের সামনে নীরবে মাথা নত করে থাকারও প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করছে।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর যন্তর মন্তরে গত মাসে হওয়া আন্দোলন ছিল তার সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় গণবিক্ষোভ। এই বিক্ষোভ গড়ে ওঠে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত গত মে মাসে আদালতের এক শুনানিতে বেকার তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’ বলেছিলেন। এর প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর করা অভিজিৎ দিপকে প্রতিষ্ঠা করেন সিজেপি; যাতে পরবর্তীতে যুক্ত হয় অনেক ভারতীয় তরুণ।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত জুনে যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে সিজেপি। একপর্যায়ে জুনের শেষের দিকে সিজেপির কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন সোনম।
দিল্লির তীব্র গরমের মধ্যে টানা ২৬ দিন ধরে অনশন চালিয়ে যান তিনি। সেসময় কেবল লবণপানি পান করতেন এই অধিকারকর্মী।
সোনম জানান, অনশনের সময় হারানো ১১ কেজি ওজনের ৬ কেজি ফিরে পেয়েছেন এরই মধ্যে। অনশনের শেষ ছয় দিনে তাকে জোর করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
তার ভাষ্য, হাসপাতালের অবস্থা ছিল ‘কারাগারের মতো’। কারো সঙ্গে দেখা করার বা মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। কক্ষের বাইরে সর্বক্ষণ পাহারায় থাকত পুলিশ।
এর মধ্যে ২০ জুলাই সিজেপির সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহিংসতা তরুণদের আরও ক্ষুব্ধ করে। দিল্লি থেকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য রাজ্যে।
একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী। এর আগের দিন ভারত সরকারের তরুণদের দাবি পূরণের আশ্বাসে অনশন ভাঙেন সোনম।
এই শিক্ষাবিদ মনে করেন, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার জরুরি। বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার খুব কমই মিল রয়েছে।
গত ২৫ বছর ধরে দেশটিতে স্নাতক পাস তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ পরীক্ষাই এমসিকিউভিত্তিক (মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন)। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সহজ করতে এ ব্যবস্থা চালু থাকলেও এটি তাদের দক্ষতা, বোঝার ক্ষমতা বা সক্ষমতা কতটা যাচাই করতে পারে, সে বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান পদ্ধতিতেও।
এই শিক্ষাবিদের মতে, পরীক্ষায় যদি ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার মূল্যায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে বিদ্যালয়গুলোও তাদের শিক্ষা পদ্ধতি বদলাতে বাধ্য হবে। এতে ভারতের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায়ও সহায়তা মিলতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আগামী ১৫ বছরে বিশ্ব ও দেশ কোন দিকে যাবে, তা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।’
তার মতে, শিশুদের শেখানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলে একদিকে যেমন তারা বেকার হয়ে পড়বে না, অন্যদিকে যেসব খাতে জনবলের প্রয়োজন, সেগুলোও দক্ষ কর্মীর সংকটে ভুগবে না।