মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার চার মাস পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্মরণে দুই দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে সপ্তাহব্যাপী বিশাল শোকমিছিল ও শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে দেড় থেকে ২ কোটি মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দুটি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি যুদ্ধ এবং কয়েক দশকের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থেকেও খামেনির বিদায় অনুষ্ঠান রাজকীয় করতে কোনো কমতি রাখছে না তেহরান।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্মীয় আবহে ঘেরা সপ্তাহব্যাপী এই বিশাল আয়োজন আজ শুক্রবার এমন এক দিনে শুরু হয়েছে, যেদিন ইরানের চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে।
ইরান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় আয়োজন।
খামেনির মরদেহ নিয়ে আগামী সোমবার থেকে শুরু হওয়া শোকমিছিলে অংশগ্রহণকারী ইরান ও ইরাকের লাখ লাখ জনতাকে সামাল দিতে সরকারি কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, ফায়ার ফাইটার, সেনা সদস্য, ত্রাণকর্মীসহ আরও অনেককে নিয়োজিত করা হয়েছে।
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ ইরাকের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানেও লাখ লাখ মানুষ এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই শোকমিছিলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। খামেনির জীবনীর ওপর তৈরি প্রামাণ্যচিত্র ও শোকগাঁথা প্রচারের আধিক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনার খবর এখন সংবাদমাধ্যমের আড়ালে চলে গেছে।
এই বিশাল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য, বিশ্ববাসী এবং ইরানের শত্রুদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠানো—তেহরান কেবল এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে টিকেই থাকেনি, বরং তাদের নিহত নেতাকে প্রতিরোধের এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে অমর করে রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় বলেছেন, ‘আমাদের জেগে উঠতে হবে। এই জাতির কান্না বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে; যাতে বিশ্ব জানতে পারে, ইরানের এই সম্মানিত ও গৌরবময় জাতি দমনের মুখে চুপ থাকবে না এবং তারা তাদের ইমামের (খামেনি) রক্ত বৃথা যেতে দেবে না।’
প্রতীকে ঘেরা এক মহাযজ্ঞ
এই পুরো আয়োজনের জন্য যে তারিখ বেছে নেওয়া হয়েছে, তার পেছনে যে গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য রয়েছে, তা স্পষ্ট।
খামেনির মরদেহের প্রতি যখন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শোক জানানো হচ্ছে, ঠিক তখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে।
অন্যদিকে এই আয়োজনের দিনক্ষণ মিলে গেছে শিয়া সম্প্রদায়ের এক ঐতিহাসিক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের শাহাদাত বার্ষিকীর সঙ্গে।
আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে হিজরি সনের মহররম মাসে। শিয়া সম্প্রদায়ে এই মাসটি শোক, বিশ্বাসঘাতকতা ও শাহাদাতের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত; বিশেষ করে সপ্তম শতাব্দীতে ইরাকের কারবালায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের শাহাদাত বরণের ঘটনা; যার বংশধর হিসেবে খামেনি নিজেকে দাবি করতেন।
খামেনির দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনকালের মূল ভিত্তিই ছিল পশ্চিমাদের প্রতি তীব্র অনাস্থা এবং অনড় চ্যালেঞ্জিং মনোভাব।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি নিহত হন। অথচ তার বিদায় আয়োজনকে ইরানের তিনটি শহর ও প্রতিবেশী ইরাকের দুটি পবিত্র শহরজুড়ে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন এটি একটি বিজয় শোভাযাত্রা; যা তার সমর্থকদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে, মৃত্যুর পরও এই নেতা হেরে যাননি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গুপ্ত হামলায় নিহত হওয়ার পর খামেনির মর্যাদা এখন ভিন্ন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। অথচ এই নেতাই তার জীবদ্দশায় ইরানের ইতিহাসে অন্যতম বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার মৃত্যু কামনা করে স্লোগান দেওয়া বিক্ষোভকারীদের নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনা তুসি সিএনএনকে বলেন, ‘এই গুপ্ত হত্যাকাণ্ড খামেনিকে জীবিত অবস্থার চেয়ে মৃত্যুর পর প্রতীকীভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।
‘খামেনিকে এখন একজন শহীদ ধর্মীয় নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, ঠিক যেভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের সম্মানিত ইমামদের স্মরণ করা হয়। এই মৃত্যু তার বিশ্বাস ও আদর্শকে সঠিক প্রমাণ করছে।’