একসময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তির নাম। ২০১১ সালে টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন। এরপর একের পর এক নির্বাচনে জয় পেয়ে নিজেকে শুধু বাংলার নয়, ভারতের জাতীয় রাজনীতিরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে এসে সেই মমতাকেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ভারতের জনপ্রিয় একটি সংবাদমাধ্যমের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস এখন কার্যত অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। দলটির বহু বিধায়ক প্রকাশ্যে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, প্রায় ৬০ জন বিধায়ক তাদের সঙ্গে রয়েছেন। তারা বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে দলীয় সংকট মোকাবিলায় তৃণমূল কংগ্রেস সম্প্রতি তাদের বিভিন্ন সাংগঠনিক কমিটি ও সহযোগী সংগঠন ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং দলকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচানোর জরুরি চেষ্টা।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মমতার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত এক দশকে তিনি দলের দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এখন দলের ভেতরের একটি বড় অংশ মনে করছে, তৃণমূল ধীরে ধীরে জনভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন থেকে নিয়ন্ত্রিত করপোরেট ধাঁচের কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। অনেক প্রবীণ নেতা ও কর্মী অভিযোগ করছেন, মাঠপর্যায়ের রাজনীতি থেকে নেতৃত্ব ক্রমশ দূরে সরে গেছে।
সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মমতার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তিনি কি অভিষেককে আগের মতোই দলের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রাখবেন, নাকি বিদ্রোহীদের দাবির মুখে নতুন কোনো পথ বেছে নেবেন? কারণ অভিষেককে সরালে পারিবারিক ও রাজনৈতিক বলয়ের একটি অংশ অসন্তুষ্ট হতে পারে, আবার তাকে বহাল রাখলে বিদ্রোহ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বর্তমান সংকট শুধু নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পেছনে আরও অনেক কারণ দেখছেন বিশ্লেষকেরা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে জনঅসন্তোষ, দুর্নীতির অভিযোগ, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি ও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ ভোটারদের একাংশকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
মজার বিষয় হলো, বিদ্রোহীরা এখনো প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছেন না। বরং তারা দাবি করছেন, তাদের আপত্তি মূলত বর্তমান সাংগঠনিক পরিচালনা পদ্ধতি ও অভিষেকের প্রভাব নিয়ে। অর্থাৎ লড়াইটি আপাতত ‘মমতা বনাম অন্যরা’ নয়, বরং ‘মমতার দল কোন পথে চলবে’ সেই প্রশ্নকে ঘিরে।
এদিকে দিল্লিতেও মমতার প্রভাব আগের মতো নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একসময় তিনি নিজেকে ভারতের বিরোধী রাজনীতির সম্ভাব্য মুখ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলায় নিজের রাজনৈতিক ঘাঁটি দুর্বল হয়ে পড়লে জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রভাবও স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর মতে, এখন দিল্লি নয়, মমতার প্রথম যুদ্ধ বাংলাকে ঘিরেই।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের বিভক্তির সঙ্গে তুলনা করছেন। সেখানেও দলীয় ভাঙন শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রতীক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যারা দীর্ঘদিন ধরে চেনেন, তারা জানেন, তিনি সহজে হার মানার মানুষ নন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির নানা উত্থান-পতন, বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন, এমনকি একাধিক নির্বাচনী পরাজয়ও তাকে থামাতে পারেনি। সেই কারণে অনেকেই মনে করেন, তাকে এখনই রাজনৈতিকভাবে শেষ বলে দেওয়া হবে বড় ভুল।
কিন্তু এটাও সত্য যে এবারকার সংকট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। কারণ এবার আঘাত এসেছে বাইরের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নয়, দলের ভেতর থেকেই। আর ইতিহাস বলে, অনেক শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতার পতন শুরু হয়েছে ঠিক এমন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকেই।
আগামী কয়েক সপ্তাহ হয়তো ঠিক করে দেবে, তৃণমূল কংগ্রেস আবারও ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে।
সূত্র: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইকোনমিক টাইমস, আরিয়ান এজ