জার্সি, আতশবাজি আর রাস্তায় অপরিচিত মানুষদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরা, নিজের প্রিয় ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলে উৎসবের রাতটা এমনই হওয়ার কথা। পরের দিন সকালে হয়তো কেবলই মনে হবে, কী দুর্দান্ত একটা রাতই না কাটল!
কিন্তু শনিবার (৩০ মে) প্যারিসের রাস্তায় যা ঘটল, তা কোনো রূপক অর্থে নয়; আক্ষরিক অর্থেই ছিল ধ্বংসযজ্ঞ।
হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে টাইব্রেকারে আর্সেনালকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখে প্যারিস সেইন্ট-জার্মেই (পিএসজি)। কিন্তু জয়ের উচ্ছ্বাস দ্রুতই ফ্রান্সের রাজধানীতে ধ্বংসযজ্ঞে রূপ নেয়।
আইফেল টাওয়ার লাল আর নীল আলোয় আলোকিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে উদযাপনের শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত দাঙ্গা, সহিংসতা আর গাড়ি পোড়ানোর মধ্য দিয়ে এক নরককুণ্ডে পরিণত হয়।
সকাল হতেই দেখা যায়, সহিংসতায় একজন নিহত হয়েছেন। ৭৮০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কমপক্ষে ২৬৪টি গাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
খেলার শেষ বাঁশি বাজার পরপরই প্যারিসের ঐতিহাসিক শঁজেলিজের রাস্তায় প্রায় ২০ হাজার সমর্থক জড়ো হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সমর্থকেরা আতশবাজি জ্বালাচ্ছেন, বাইক পুড়িয়ে দিচ্ছেন এবং দোকানের কাচ ভেঙে ফেলছেন।
ফরাসি পুলিশ জানিয়েছে, পিএসজির ঘরের মাঠ পার্ক দে প্রাঁস স্টেডিয়ামের কাছের একটি বেকারি ও রেস্তোরাঁও ভাঙচুর করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যাচ চলাকালে স্টেডিয়ামের বাইরে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও বোতল ছুড়ে মারেন।
পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, প্রায় ১৫০ জন সমর্থক স্টেডিয়ামের একটি গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের পিছু হটতে বাধ্য করে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ২২ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়, যার মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন ৮ হাজার।
বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে শহরের বেশ কিছু অংশে ট্রাম চলাচল স্থগিত, কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং বাস সেবা সীমিত করা হয়।
গত বছর পিএসজির চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের সময়ও সমর্থকেরা ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার ম্যাচ শুরুর আগে শঁজেলিজের বহু দোকানের জানালা কাঠের বোর্ড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে সহিংসতার এই ঘটনা ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলেছেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।
তিনি জানান, সংঘর্ষে সাতজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। এর আগে তিনি এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ বলে দাবি করেছিলেন।
অন্যদিকে আর্সেনালের জন্য রাতটি ছিল চরম হতাশার। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্লাবটি চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের।
শহরে এমন বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও রোববার বিকেলে পিএসজি খেলোয়াড়দের নিয়ে বিজয় শোভাযাত্রা বের হওয়ার কথা রয়েছে। শোভাযাত্রাটি আইফেল টাওয়ারের কাছে শঁ দ্য মার্স এলাকা দিয়ে যাওয়ার কথা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ দলের জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন বলে জানা গেছে।
শনিবার রাতভর সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্সের ডানপন্থী রাজনীতিক ও তিনবারের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারি লো পেন বলেন, ‘কেবল ফ্রান্সেই একটা ফুটবল ক্লাবের জয় দাঙ্গা ডেকে আনে। কেবল ফ্রান্সেই মানুষকে বিজয়ের রাতে সহিংসতা এড়াতে নিজের ঘরে বন্দি থাকতে বাধ্য হতে হয়।’