পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় ও দলটির ভাষায় একটি ‘ডাবল-ইঞ্জিন সরকার’ (কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতায়) গঠনের পর পূর্ব ভারতের অন্যতম রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল বিষয় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে দ্রুত মনোযোগ স্থানান্তরিত হয়েছে।
কয়েক বছর ধরে সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, অবৈধ অভিবাসন, চোরাচালান ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে বিলম্বের মতো বিষয়গুলো কেবলই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু এখন বিজেপি নেতৃত্বের মতে, উদ্দেশ্য হলো কেবল স্লোগান এবং লোকদেখানো প্রচারণার ঊর্ধ্বে উঠে সরাসরি প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর্যায়ে প্রবেশ করা।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, সীমান্ত সমস্যাটিকে কোনো প্রতীকী ঘোষণার মাধ্যমে না দেখে, বরং বাস্তবসম্মত এবং ফলাফলভিত্তিক উপায়ে সমাধান করতে হবে।
এই প্রক্রিয়ার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, শাহ বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল প্রচারের উদ্দেশ্যে কোনো ‘অর্ধসমাপ্ত’ বা দায়সারা অভিযান চালানো যাবে না।
তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি পদক্ষেপ অবশ্যই আইনগতভাবে টেকসই, কূটনৈতিকভাবে সতর্ক এবং কার্যকারিতার দিক থেকে ফলপ্রসূ হতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) শীর্ষ কর্মকর্তারা এরই মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছেন।
এবার মূল জোর দেওয়া হচ্ছে, যত্রতত্র বা তাড়াহুড়ো করে পুশব্যাক (জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো) অভিযান না চালিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার ওপর।
সূত্র অনুযায়ী, অমিত শাহ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
অতীতে যখনই যথাযথ যাচাইকরণ বা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের স্রেফ পুশব্যাক করা হতো, তখন ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাত।
এবার কৌশলটি ভিন্ন বলেই মনে হচ্ছে। কেন্দ্র এমন একটি প্রক্রিয়া চায়, যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের সঠিকভাবে শনাক্ত ও নথিবদ্ধ করা হবে এবং তারপর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এর উদ্দেশ্য, আন্তর্জাতিক বিতর্ক এড়িয়ে সুশৃঙ্খল উপায়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গিটি এই উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কেবল একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়। এটি একটি মানবিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে।
এমনকি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক বক্তৃতায় যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে মেক্সিকো সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়ার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন অব্যাহত ছিল।
একটি দীর্ঘ ও অরক্ষিত আন্তর্জাতিক সীমানা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করা কতটা কঠিন, তা অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বোঝাতে এখন প্রায়ই সেই উদাহরণটি উদ্ধৃত করা হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অংশটি আরও বেশি জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
সীমান্তের একটি বড় অংশ ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম, কৃষিজমি, নদীমাতৃক এলাকা, চরাঞ্চল, বন ও দুর্গম ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে।
বেশ কিছু জায়গায় তথাকথিত ‘জিরো লাইন’ বা প্রকৃত আন্তর্জাতিক সীমানাটি এমনসব জনবসতির ভেতর দিয়ে গেছে, যেখানে পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে।
ভারত সরকার এখন পশ্চিমবঙ্গজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রকল্পগুলোর গতি বাড়িয়েছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, পুরো সীমান্তজুড়ে বেড়া দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করা সহজ কাজ নয়।
সরকার বিশ্বাস করে, এই প্রক্রিয়া কেবল শক্তির জোরে সফল হতে পারে না। স্থানীয় জনগণকে বোঝাতে হবে এবং তাদের আস্থা নিতে হবে।
সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী কৃষক, গ্রামবাসী ও জমির মালিকদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে, কারণ কাঁটাতারের বেড়া প্রায়ই তাদের কৃষিকাজে যাতায়াত, চলাচল এবং জীবিকাকে প্রভাবিত করে।
২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।
এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬৯৬ কিলোমিটার অংশে এরই মধ্যে বেড়া দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার এলাকা বেড়াবিহীন অবস্থায় রয়েছে।
নদীমাতৃক ও জলাভূমি অঞ্চলের কারণে প্রায় ১১২ দশমিক ৭৮০ কিলোমিটার অংশে প্রচলিত কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া ‘সম্ভব নয়’ বলে মনে করা হয়। আর প্রায় ৪৫৬ দশমিক ২২৪ কিলোমিটার অংশে কারিগরিভাবে বেড়া দেওয়া সম্ভব হলেও তা এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী বিজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সীমান্ত বেড়া নির্মাণকে নতুন সরকারের অন্যতম শীর্ষ প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় অগ্রগতি হলো, বেড়া নির্মাণ ও সীমান্ত অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বিএসএফের কাছে প্রায় ৬০০ একর জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শিলিগুড়ির কাছাকাছি ফাঁসিদেওয়ায় রাজ্য সরকার এরই মধ্যে একটি ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছে, যেখানে গত ২১ ও ২২ মের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
মুখ্য সচিব ও ভূমি দপ্তরকে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বাকি সব জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কাঁটাতারের বেড়া ছাড়াও নতুন বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) এবং বিএসএফের অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধার জন্য জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রাজ্য সরকার।
এটি নীতিগত দিক থেকে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। কারণ অতীতে এই কাজের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর অন্যতম ছিল জমি অধিগ্রহণ এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা।
জয়ন্ত ঘোষাল এনডিটিভির কন্ট্রিবিউটিং সম্পাদক
এনডিটিভি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত