ভারতের কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড় শহরের মাচিলাকাথু পরিবারের কাছে এবারের ঈদ এসেছে এক পরম স্বস্তি ও পুনর্মিলনের বার্তা নিয়ে। সৌদি আরবের কারাগারে দীর্ঘ দুই দশক বন্দিজীবন কাটিয়ে নিশ্চিত ফাঁসির হাত থেকে রেহাই পেয়ে অবশেষে ঘরে ফিরেছেন তাদের সন্তান।
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, নিজের তত্ত্বাবধানে থাকা এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনায় ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে সৌদি কারাগারে বন্দি ছিলেন আব্দুল রহিম। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকালে সৌদি আরবের এক্সিট ভিসা নিয়ে কেরালায় পৌঁছান তিনি।
আব্দুল রহিম যখন কোঝিকোড় বিমানবন্দর থেকে বের হন, তখন তার পৈতৃক বাড়ির সামনে শত শত মানুষ তাকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকের কাছে রহিমের স্মৃতি কিছুটা আবছা হয়ে গিয়েছিল। আর তরুণদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার প্রতীক।
রহিমের জীবনকাহিনি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কেরালাবাসীদের এতটাই আবেগপ্রবণ করেছিল যে, তার মুক্তির জন্য তারা এক অভূতপূর্ব ক্রাউডফান্ডিং (গণ তহবিল) অভিযান শুরু করেন এবং তার মুক্তি নিশ্চিত করেন।
বাড়ি ফিরে রহিম তার জীবন ফিরে পাওয়ার পেছনে অবদান রাখা সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সব কেরালাবাসীকে ধন্যবাদ জানাই, যারা আমার মুক্তিতে ভূমিকা রেখেছেন।’
সৌদি আরবে যাওয়ার আগে কেরালায় অটোরিকশা ও স্কুলের বাস চালাতেন রহিম। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রহিম চালকের চাকরি পেয়ে ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর রিয়াদে যান।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রহিমকে তার নিয়োগকর্তার ১৭ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী ছেলের দেখাশোনার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল, যে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সে বছরের ২৪ ডিসেম্বর রহিম যখন গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং ওই কিশোর পেছনের সিটে বসা ছিল, তখন অসাবধানতাবশত শ্বাসযন্ত্রটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এর ফলে ছেলেটি মারা যায়।
সৌদি আরবে পৌঁছানোর ২৮ দিনের মাথায় ২৬ বছর বয়সী রহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০১১ সালে সৌদির একটি আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
উচ্চ আদালতও এই সাজা বহাল রাখলে কেরালায় তার পরিবার যেকোনো মুহূর্তে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে থাকে।
অবশেষে ২০২৪ সালের এপ্রিলে নিহত কিশোরের পরিবার ৩৪ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে রহিমকে ক্ষমা করতে রাজি হয়।
রহিমের পরিবারের পক্ষে একা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মালায়ালি সম্প্রদায়ের অভূতপূর্ব প্রচেষ্টায় এই বিশাল তহবিল সংগ্রহ করা হয়।
সাধারণ শ্রমিক, প্রবাসী, সামাজিক সংগঠন থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তি সবাই এই তহবিলে সাধ্যমতো সহায়তা করেন। এটি কেরালার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ গণঅর্থায়নের নজির হয়ে দাঁড়ায়।
নিহত কিশোরের পরিবার ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করার পর রহিমের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হয়।
তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেয়, রহিমকে ২০ বছরের কারাদণ্ড পূর্ণ করতে হবে। চলতি বছরের ২০ মে তার সেই মেয়াদ শেষ হয়।