যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর নিঃশব্দে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ড্রোন তৈরির প্রকল্প শুরু করেছে। তারা এরই মধ্যে ৩০ হাজার ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোনের ক্রয়াদেশ দিয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
তবে এই বিশাল উদ্যোগের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বড় দুর্বলতা।
এই ড্রোনগুলোর প্রতিটি সচল রাখার জন্য প্রয়োজন রেয়ার আর্থ বা বিরল মৃত্তিকা খনিজ থেকে তৈরি বিশেষ চুম্বক।
খনি থেকে প্রথমে এই রেয়ার আর্থ খনিজ উত্তোলন করা হয়। এই খনিজগুলো প্রক্রিয়াজাত করে অত্যন্ত শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক তৈরি করা হয়, যা ড্রোনের মোটরের ভেতরে বৈদ্যুতিক শক্তি জোগাতে ব্যবহার করা হয়।
একটি শিল্প প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এই খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৯৮ শতাংশই উৎপাদিত হয় চীনে।
এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখন রেয়ার আর্থ খনিজের জন্য একটি বিকল্প সরবরাহ চেইন বা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে বলে মঙ্গলবার (১৯ মে) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে এএফপি।
যুক্তরাষ্ট্রের খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরইঅ্যালোয়েজের মতো কোম্পানিগুলো মূলত এই কৌশলগত সংকট মেটাতেই কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, উত্তর আমেরিকায় একমাত্র তাদেরই এমন একটি সাপ্লাই চেইন আছে, যা খনি থেকে কাঁচামাল তোলা থেকে শুরু করে সরাসরি ড্রোনে ব্যবহারের চুম্বক তৈরি পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই চীনের প্রভাবমুক্ত।
তারা মূলত খনিজ ধাতু ও অ্যালয় প্রক্রিয়াজাত করে, যা সরাসরি সামরিক বাহিনীর ম্যাগনেট তৈরিতে কাজে লাগে।
পেন্টাগনকে কেন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে
এই সংকটের গুরুত্ব বোঝাতে বিশ্লেষকেরা ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে আঙুল তুলছেন। গত দুই বছরে ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা মেশিনগান আবিষ্কারের পর আর দেখা যায়নি। কেবল ২০২৪ সালেই ইউক্রেন ১২ লাখের বেশি ড্রোন তৈরি করেছে এবং এগুলোর প্রায় প্রতিটিতে ব্যবহৃত ম্যাগনেটের উৎস ছিল চীনের সাপ্লাই চেইন।
ওয়াশিংটন এই বিষয়টি খুব ভালো করেই অনুধাবন করেছে।
গত জুনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় খাতে ড্রোন উৎপাদন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ‘আমেরিকান ড্রোনের আধিপত্য উন্মোচন’ শীর্ষক একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন।
এর ঠিক এক মাস পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আমেরিকার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন কেনার প্রক্রিয়া আরও জোরদার করার নির্দেশ দেন। এমনকি ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা বাজেটে এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় বা চালকহীন যুদ্ধপ্রযুক্তির জন্য ১৩ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়।
এটি স্পষ্ট করে দেয়, মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনায় ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত প্ল্যাটফর্মগুলো কতটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিচ্ছে।
যে সাপ্লাই চেইন টাকা দিয়েও ঠিক করা যাচ্ছে না
বিশাল তহবিল বরাদ্দ করা সত্ত্বেও একটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েই গেছে। রেয়ার আর্থ খনিজের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীলতা।
পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ড্রোনের মোটর থেকে শুরু করে মিসাইল গাইডেড সিস্টেম, সেন্সর এবং যুদ্ধবিমানের সিস্টেমসহ যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৯০০টি অস্ত্র ব্যবস্থার প্রায় ৮০ হাজার উপাদানের জন্য চীনের রেয়ার আর্থ খনিজের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অ্যারোভায়রনমেন্ট, ক্রাটোস ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সলিউশনস এবং প্যালান্টিয়ার টেকনোলজির মতো কোম্পানিগুলো স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ ও এআই চালিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের প্রযুক্তিতে আরও গভীরভাবে নজর দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও এসব প্ল্যাটফর্ম শেষ পর্যন্ত একই সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরশীল।
সমীকরণটি খুব সহজ। বেইজিং যদি এই সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিকল্প কোনো সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। তারপরও রেয়ার আর্থ খাতে এখন প্রচুর পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে।
যেমন, চীনের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি বন্ধ করতে ট্রাম্প প্রশাসন চাপ দিচ্ছে। এই চাপের মুখে ভলকান নামের একটি কোম্পানি এখন চীনের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় চুম্বক কারখানা তৈরি করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন খনি অনুমোদনের জটিলতা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
একটি শিল্প প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে খনির লাইসেন্স বা অনুমতি পেতেই সাধারণত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যায়।
সব মিলিয়ে পরিকল্পনা ও উন্নয়নসহ একটি নতুন খনি থেকে পুরোদমে উৎপাদন শুরু করতে গড়ে ২৯ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বৈশ্বিক পরিমাপে এটি যেকোনো খনি চালুর ক্ষেত্রে দীর্ঘতম সময়ের একটি রেকর্ড।