কেমন সেই রাজনীতি, যা মানুষকে তার নেতার জন্য জীবন দিতে উদ্বুদ্ধ করে? তামিলনাড়ুর প্রেক্ষাপটে এটি কেবল কোনো আলঙ্কারিক কথা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা।
শোকের মুহূর্তে, পরাজয়ের গ্লানিতে, এমনকি গত সপ্তাহে বিজয়ের সরকার গঠনের আলোচনার সময় ক্ষমতার হাতছানিতেও, এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে। এটি কোনো নতুন গল্প নয়; তামিলনাড়ু এমন দৃশ্য আগেও বহুবার দেখেছে।
সময়টা ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর। পুরো তামিলনাড়ু যেন শোকের সাগরে নিমজ্জিত। রাস্তায় শোকাতুর মানুষের ঢল। দলীয় কার্যালয়ের সামনে পুরুষদের প্রকাশ্যে ডুকরে কাঁদতে দেখা যাচ্ছে।
কোনো কোনো সমর্থক বিষপান করছেন, কেউবা গায়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন। যখন খবর ছড়িয়ে পড়ল এম জি রামাচন্দ্রন আর নেই, রাজ্যজুড়ে এই শোক প্রাণঘাতী রূপ নিল।
রামাচন্দ্রন ছিলেন নিখিল ভারত আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগামের (এআইএডিএমকে) প্রতিষ্ঠাতা, তামিল সিনেমার কিংবদন্তি এবং রাজ্যের প্রথম চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে রাজনীতিতে আসা মুখ্যমন্ত্রী।
তবে কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি তার পদের চেয়েও বড় কিছু ছিলেন। তিনি ছিলেন তাদের পুরাচি থালাইভার বা বিপ্লবী নেতা। এমন এক মানুষ যিনি রূপালি পর্দা থেকে নেমে এসে মানুষের জীবনে আবির্ভূত হয়েছিলেন রক্ষাকর্তা এবং নায়ক হিসেবে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রামাচন্দ্রন তামিলনাড়ু শাসন করেছেন। টানা তিনবার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় থাকাকালীনই মৃত্যবরণ করেন তিনি।
তার মৃত্যু কেবল একজন মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্থান ছিল না। অনেকের কাছে এটি ছিল অত্যন্ত আপনজন বা অভিভাবক হারানোর মতো।
তামিলনাড়ুতে শোক থেকে বিয়োগান্তক ঘটনার জন্ম নেওয়ার এটিই শেষ নজির ছিল না। এই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বারবার, যা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, এই রাজ্যের রাজনীতি কেবল ভোটের লড়াই নয়।
২০০১ সালে যখন দুর্নীতির দায়ে জয়ললিতাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, তখন তার সমর্থকেরা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি যখন পুনরায় কারাবন্দী হন, তখন রাজ্যে আবারও শোকের ছায়া নেমে আসে। আত্মহত্যা, গায়ে আগুন দেওয়া এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটে।
২০১৬ সালে তার মৃত্যুর পর এআইএডিএমকে দাবি করেছিল, অন্তত ৪৭০ জন সমর্থক তাদের প্রিয় ‘আম্মা’কে হারানোর শোকে প্রাণ হারিয়েছেন।
এরপর এলেন বিজয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তামিল সিনেমার এই সুপারস্টার যখন রাজনীতির ময়দানে নিজের প্রভাব জানান দিচ্ছিলেন, তখন তাকে একপলক দেখতে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে।
প্রখর রোদ উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা দাঁড়িয়ে ছিল সেই ত্রাতার অপেক্ষায়। সেই গণজমায়েত যখন শেষ হলো, ততক্ষণে ৪১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
রূপালি পর্দার নায়ক আর রাজনৈতিক ত্রাতার মধ্যকার সীমারেখা যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই অস্পষ্ট, সেখানে বিজয়ের এই উত্থান কোনো ব্যতিক্রম ছিল না।
এটি ছিল পরিচিত সেই চিত্রনাট্যেরই সর্বশেষ অধ্যায়।
অবহেলিতদের পক্ষে ভোট?
তামিলনাড়ুর ভোটারদের মধ্যে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। সেখানে নিজস্ব জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয় থাকলেও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তা বড় হয়ে দাঁড়ায় না। সমাজে জাত-পাতের ব্যাপক ভেদাভেদ আছে।
প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ তফসিলি জাতির এবং ৭৫ শতাংশের বেশি মানুষ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর। তা সত্ত্বেও ভোট দেওয়ার সময় তারা ধর্ম বা জাতের হিসাব দেখে না।
এর পরিবর্তে ভোটাররা এমন সব ব্যক্তিত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যারা দুঃখ-কষ্ট লাঘব এবং উন্নয়নের একটি সার্বজনীন ভাবমূর্তি তুলে ধরতে পারেন।
ধর্মীয় জনমিতি এই জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। রাজ্যে হিন্দু ৮৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ, মুসলিম ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং খ্রিস্টান ৬ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও নির্বাচনী সংহতি খুব কমই এই ধর্মীয় বিভাজন অনুযায়ী কাজ করে।
বরং রাজনৈতিক বৈধতা প্রায়শই বঞ্চনা, সংগ্রাম এবং নৈতিক সুরক্ষার আখ্যানের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এটি নেতাদের তাদের আত্মপরিচয়ের সীমানা পুরোপুরি বিসর্জন না দিয়েই তা অতিক্রম করার সুযোগ করে দেয়।
ঠিক এখানেই অবহেলিত বা ‘ভেতর থেকে উঠে আসা ত্রাণকর্তার’ ছকটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এম জি রামাচন্দ্রন এবং করুণানিধির মতো নেতারা এই পরিবর্তনের উজ্জ্বল উদাহরণ।
তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি কোনো উঁচু বংশের মর্যাদা বা আভিজাত্য থেকে আসেনি। বরং তা গড়ে উঠেছিল নিজের জীবনের চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর কঠোর সংগ্রামের অভিজ্ঞতায়। শাসক হিসেবে যখন তারা নীতিনির্ধারণ করেছেন, তখন সাধারণ মানুষের সেই কষ্টগুলোকেই সবার আগে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বস্তুত রামাচন্দ্রনের মন্ত্রিসভার কাছে করা সেই প্রথম প্রশ্ন, ‘কার শৈশবে দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা আছে?’—এটি কেবল প্রতীকী ছিল না। এটি মূলত অভিজ্ঞতাজাত সহমর্মিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি শাসনতান্ত্রিক নৈতিকতাকে শক্তিশালী করেছিল।
স্কুলগামী শিশু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো এই আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল।
এই কাঠামোতে বিজয়ের মতো ব্যক্তিত্বদের দেখা যেতে পারে। তিনি ভেলালার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মতো একটি সামাজিকভাবে চিহ্নিত অথচ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত পটভূমি থেকে উঠে এসেছেন।
তাকে সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকারী হিসেবে পড়া যেতে পারে, যেখানে নেতারা নিজের পরিচয়কে অস্বীকার করেন না, বরং কৌশলগতভাবে সেটিকে ভাগ করে নেওয়া বঞ্চনা এবং নৈতিক সার্বজনীনতার একটি বৃহত্তর ভাষায় রূপান্তরিত করেন।
তামিলনাড়ুতে সিনেমা যেভাবে হয়ে উঠল রাজনীতির পাঠশালা
তামিলনাড়ুতে সিনেমা থেকে রাজনীতিতে আসার বিষয়টি প্রচলিত ব্যবস্থার কোনো ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি স্বয়ং রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিবর্তনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল তখন, যখন সি এন আন্নাদুরাই এবং এম করুণানিধি নাটক ও চিত্রনাট্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন।
একজন চিত্রনাট্যকার থেকে পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠার মাধ্যমে করুণানিধি এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যে, গল্প বলার দক্ষতা কীভাবে রাজনৈতিক কর্তৃত্বে রূপান্তরিত হতে পারে।
তবে এই সম্পর্ককে একটি বিশাল রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপ দিয়েছিলেন রামাচন্দ্রন। রূপালি পর্দার দাপুটে নায়ক থাকাকালীনই তিনি তার পর্দার ‘দয়ালু রক্ষাকর্তা’র ভাবমূর্তি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে নিয়ে আসেন।
১৯৭৭ সালে তিনি এআইএডিএমকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুখ্যমন্ত্রী হন। জনগণের কাছে তার ‘গণমানুষের নেতা’র ভাবমূর্তি এতটাই প্রবল ছিল যে, সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে সিনেমার চরিত্র আর বাস্তবের নেতার মধ্যকার পার্থক্য ক্রমে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই মডেলটিকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করেছিলেন জয়ললিতা। সফল চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের পর তিনি রামাচন্দ্রনের রাজনৈতিক দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তীতে ‘আম্মা’ হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলেন। তিনি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করেছিলেন।
রামাচন্দ্রন ও জয়ললিতা মিলে ‘অভিনেতা-কেন্দ্রিক নেতৃত্ব’কে ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক পরীক্ষার বদলে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিণত করেন।
আস্থা ঝা টাইমস অব ইন্ডিয়ার রাজনীতিবিষয়ক লেখক। রাজনীতি ছাড়াও তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য, বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ এবং সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে নেওয়া