কলকাতা ছাড়িয়ে গোটা ভারতেই ভবানীপুর আসনটি তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। এই আসনটির শিকড় বাংলার রাজনীতিতে অনেক গভীরে।
সত্তরের দশকে এই ভবানীপুরই বাংলাকে দিয়েছিল কংগ্রেসের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে। এছাড়া সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতারাও বিভিন্ন সময়ে এই ক্ষমতার কেন্দ্রটি নিজেদের দখলে রেখেছিলেন।
তবে ৪ মে এই আসনটিই তৃণমূল নেত্রীর জন্য সবথেকে বড় বিপর্যয় নিয়ে আসে। তারই একসময়ের শিষ্য শুভেন্দু অধিকারী ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে তাকে পরাজিত করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুরে হারের পেছনে ৬টি কারণ খুঁজে বের করেছে এনডিটিভি।
প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া: যখন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তৈরি হয়, তখন নিরাপদ আসনগুলোও আর নিরাপদ থাকে না। ২০২১ সালে তৃণমূলের জন্য ‘নিরাপদ আসন’ হিসেবে পরিচিত এই ভবানীপুর থেকে মমতা উপনির্বাচনে লড়েছিলেন। সেসময় ‘দিদিকে’ জায়গা করে দিতে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
শুভেন্দু অধিকারী ফ্যাক্টর: বাংলায় বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে কোনো মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা না করলেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শুভেন্দু অধিকারীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, মমতার নিজের ঘাঁটি থেকেই তার মোকাবিলা করতে। শুভেন্দু আগেই নন্দীগ্রামে মমতাকে পরাজিত করেছিলেন। এটি বিজেপির পক্ষে এমন জনমত তৈরি করেছিল, যদি কেউ তাকে হারাতে পারে, তাহলে তিনি একমাত্র শুভেন্দুই।
ভোটব্যাংকে ধস ও সাংগঠনিক ত্রুটি: ভবানীপুরে মমতার ভোটের হার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২১ সালের ৭২ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে তা ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, তার সমর্থন বিজেপির দিকে সরে গেছে। স্ট্রংরুমে (যেখানে ভোটগ্রহণের পর ব্যালট বাক্সগুলো ভোট গণনার আগ পর্যন্ত কড়া পাহারায় রাখা হয়) তীব্র লড়াই থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচার সবক্ষেত্রেই বিজেপি ভবানীপুরের মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল। সেসময় মমতা ব্যস্ত ছিলেন সারা বাংলায় তার দলের প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করতে। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, ভবানীপুরের আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে পাঁচটিতেই বিজেপি এগিয়ে ছিল। তারা সেই আধিপত্য এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিজেপির সুনির্দিষ্ট প্রচার: বিজেপি এই নির্বাচনকে (তৃণমূলের) ‘ভয়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন’ হিসেবে তুলে ধরেছিল এবং এই বার্তাটি কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রচার কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে বিজেপি এবার মমতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণে না গিয়ে বাংলার জন্য তাদের বিকল্প পরিকল্পনা ও ভিশন তুলে ধরে। অন্যদিকে সাধারণ ভোটাররা খোলাখুলিভাবে ‘পরিবর্তন’, দুর্নীতি ও তৃণমূলের ‘হুমকি সংস্কৃতির’ বিরুদ্ধে কথা বলেন। ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের নানা ধরনের অন্যায় কর্মকাণ্ডও তাদের বিরুদ্ধে জনরোষে ভূমিকা রাখে।
এসআইআর ফ্যাক্টর: ভোটার তালিকা থেকে ‘ভুয়া ভোটার’ বাদ দিতে এবং তালিকা স্বচ্ছ করতে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চালানো হয়েছিল। এর ফলে ভোট জালিয়াতি এবং কারচুপির যে সংস্কৃতি অতীতে বাম বা তৃণমূল সব ক্ষমতাসীন দলকেই সাহায্য করে এসেছে, তা বন্ধ ছিল। এছাড়া তৃণমূল কংগ্রেস ভবানীপুর থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম কেটে দেওয়ার যে অভিযোগ করেছিল, তা এই লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে।
আরজি কর প্রভাব: আরজি কর-এর নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর এটিই ছিল বাংলার প্রথম নির্বাচন। বিজেপি কৌশলগতভাবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে নিহতের মা রত্না দেবনাথকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেয়। এটি কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের দিকে আবারও সবার নজর কেড়ে নেয়। কলকাতার চিকিৎসকেরা আন্দোলনে নামার আগ পর্যন্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াও মমতার পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে।